
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : বাংলাদেশের পর্যটন খাত বর্তমানে একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। কক্সবাজারের বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনের অপরূপ ম্যানগ্রোভ বন, সিলেটের চা-বাগান, বান্দরবান-খাগড়াছড়ির পাহাড়ি সৌন্দর্য এবং প্রাচীন পুরাকীর্তি—এসব সম্পদের সমন্বয়ে দেশটি বিশ্বের পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে। তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালে পর্যটন খাত দেশের জিডিপিতে প্রায় ২.৩ থেকে ৪ শতাংশ অবদান রেখেছে এবং ২০২৭ সাল নাগাদ এ খাতে ১৫ লাখেরও বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বলে পিকেএসএফ-এর একটি গবেষণায় উঠে এসেছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় খাতে ব্যবসা শুরু করার আগে উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট জ্ঞান, পরিকল্পনা এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। অপর্যাপ্ত প্রস্তুতিতে নেমে পড়লে সিজনালিটি, অবকাঠামোগত সমস্যা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো চ্যালেঞ্জগুলো ব্যবসাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এই প্রতিবেদনে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব কোন কোন বিষয় জানা উচিত এবং কীভাবে ধাপে ধাপে ব্যবসা শুরু করা যায়।
পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসায় (ট্রাভেল এজেন্সি, ট্যুর অপারেটর, হোটেল, রিসোর্ট, ইকো-ট্যুরিজম বা অনলাইন ট্রাভেল প্ল্যাটফর্ম) নামার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাজার গবেষণা। বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান—২০২৩ সালে প্রায় ৩ কোটির বেশি দেশীয় পর্যটক ভ্রমণ করেছেন, যেখানে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা ৬ লাখ ৫৫ হাজারের মতো। কিন্তু বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৯টি দেশের মধ্যে ১০৯তম, যা অবকাঠামো, নিরাপত্তা এবং মার্কেটিংয়ের দুর্বলতা তুলে ধরে। উদ্যোক্তাকে প্রথমে বুঝতে হবে লক্ষ্য গ্রাহক কারা—শহুরে যুবক-যুবতী, পরিবার, ধর্মীয় পর্যটক (উমরাহ-হজ্জ), কর্পোরেট ক্লায়েন্ট নাকি বিদেশি অ্যাডভেঞ্চার সিকার্স। প্রতিযোগিতা বিশ্লেষণ করুন: কক্সবাজারে হোটেল-রিসোর্টের ঘনত্ব বেশি, কিন্তু সুন্দরবন বা পাহাড়ি এলাকায় ইকো-ট্যুরিজমের সুযোগ অপর্যাপ্ত। সিজনালিটি একটি বড় ঝুঁকি—বর্ষাকালে অনেক স্পট বন্ধ হয়ে যায়, তাই বৈচিত্র্যময় প্যাকেজ (অফ-সিজন ডিসকাউন্ট, কালচারাল ফেস্টিভ্যাল) তৈরি করতে হবে।
আরেকটি অত্যাবশ্যক বিষয় হলো আইনি ও নিয়ন্ত্রণমূলক প্রয়োজনীয়তা। বাংলাদেশে পর্যটন ব্যবসা চালাতে প্রথমে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি)-এ কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করতে হয়—প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি সবচেয়ে নিরাপদ। এরপর স্থানীয় সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) এবং ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন (বিআইএন) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে সংগ্রহ করতে হয়। ট্যুর অপারেটর বা ট্রাভেল এজেন্সির জন্য বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি)-এর রেজিস্ট্রেশন অপরিহার্য। অনলাইনে btbregistration.gov.bd পোর্টালে আবেদন করতে হয়—এর জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র, ট্রেড লাইসেন্সের কপি, টিআইএন, ব্যাংক সার্টিফিকেট (ট্যুর অপারেটরের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১০ লাখ টাকা ব্যালেন্স) এবং অফিসের ঠিকানার প্রমাণপত্র জমা দিতে হয়। টিকিটিং সার্ভিস দিলে সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশ (সিএএবি) লাইসেন্স এবং আন্তর্জাতিক এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ) অ্যাক্রেডিটেশন প্রয়োজন হতে পারে। হোটেল ব্যবসার ক্ষেত্রে তিন-পাঁচ তারকা হোটেলের লাইসেন্স মন্ত্রণালয় থেকে এবং এক-দুই তারকার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে নিতে হয়। অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (এটিএবি) মেম্বারশিপ নিলে শিল্পের স্বীকৃতি বাড়ে। এসব লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা অবৈধ এবং জরিমানা বা বন্ধের ঝুঁকি রয়েছে।
আর্থিক পরিকল্পনা ছাড়া কোনো ব্যবসা টেকে না। পর্যটন ব্যবসায় প্রাথমিক বিনিয়োগ নির্ভর করে স্কেলের ওপর—ছোট ট্রাভেল এজেন্সির জন্য ২০-৫০ লাখ টাকা (অফিস, ওয়েবসাইট, মার্কেটিং), হোটেল-রিসোর্টের জন্য কোটি টাকার বেশি। ব্যাংক ঋণ, বিনিয়োগকারী বা সরকারি ইনসেনটিভ (যেমন অতীতে ১০০০ কোটি টাকার প্যাকেজ) ব্যবহার করা যায়। বাজেট তৈরি করতে হবে অফিস ভাড়া, স্টাফ বেতন, মার্কেটিং, ইনস্যুরেন্স এবং প্রযুক্তি (বুকিং সফটওয়্যার)-এর জন্য। সাসটেইনেবিলিটি এখন বড় ফ্যাক্টর—ইকো-ট্যুরিজমে পরিবেশবান্ধব অনুশীলন (প্লাস্টিক-মুক্ত, লোকাল কমিউনিটি সম্পৃক্ততা) গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে এবং আন্তর্জাতিক ফান্ডিং পাওয়া সহজ হয়। প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য: অনলাইন বুকিং সিস্টেম, মোবাইল অ্যাপ, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং ছাড়া আজকের যুগে টিকে থাকা কঠিন। গ্রাহক সেবা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে—ট্যুর গাইডদের প্রশিক্ষণ, ইমার্জেন্সি প্ল্যান এবং ইনস্যুরেন্স কভারেজ।
ব্যবসা শুরু করার ধাপগুলো সুনির্দিষ্ট। প্রথমে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা (বিজনেস প্ল্যান) তৈরি করুন—লক্ষ্য, সেবা (ডোমেস্টিক ট্যুর, ইন্টারন্যাশনাল প্যাকেজ, কর্পোরেট ট্রাভেল), আয়-ব্যয়ের প্রজেকশন এবং মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি অন্তর্ভুক্ত রাখুন। দ্বিতীয় ধাপে আরজেএসসি-তে কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করে ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন ও ভ্যাট নিন। তৃতীয় ধাপে বিটিবি বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ লাইসেন্স সংগ্রহ করুন। চতুর্থ ধাপে অফিস স্থাপন—ঢাকা, চট্টগ্রাম বা পর্যটন স্পটের কাছে প্রাইম লোকেশন বেছে নিন। অনলাইন মডেল হলে ওয়েবসাইট ও অ্যাপ তৈরি করুন। পঞ্চম ধাপে স্টাফ নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ—ভাষা দক্ষতা, আইটি জ্ঞান এবং কাস্টমার হ্যান্ডলিং জরুরি। ষষ্ঠ ধাপে সাপ্লায়ার পার্টনারশিপ গড়ুন—হোটেল, এয়ারলাইন্স, ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি। সপ্তম ধাপে মার্কেটিং শুরু করুন—ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, গুগল অ্যাডস এবং ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে ব্র্যান্ডিং। অষ্টম ধাপে অপারেশন চালু করে ক্রমাগত মনিটরিং করুন—কাস্টমার ফিডব্যাক নিয়ে উন্নয়ন করুন।
চ্যালেঞ্জগুলোকে সামনে রেখে সফলতা অর্জন সম্ভব। অবকাঠামোগত দুর্বলতা (রাস্তাঘাট, বিমানবন্দর), দক্ষ জনবলের অভাব এবং বৈশ্বিক ঘটনা (মহামারী, রাজনৈতিক অস্থিরতা) খাতকে প্রভাবিত করে। তাই সরকারের ট্যুরিজম মাস্টার প্ল্যান (২০২৪-২০৪১) এবং ইনসেনটিভের সুযোগ নিন। সাসটেইনেবল ট্যুরিজম অনুসরণ করে লোকাল কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করুন—এতে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডেটা-ড্রিভেন সিদ্ধান্ত নিন। উদ্যোক্তাদের জন্য পরামর্শ: ছোট থেকে শুরু করুন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে প্রাধান্য দিন এবং ক্রমাগত শিখুন। বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সম্ভাবনা অসীম—যথাযথ প্রস্তুতি এবং উদ্যোগী মনোভাব নিয়ে নামলে এটি শুধু লাভজনক ব্যবসাই নয়, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও অবদান রাখবে। সঠিক পথে চললে ২০৩০ সাল নাগাদ এ খাত জিডিপিতে ১০ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখতে পারে, যা লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন দুয়ার খুলবে।
প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ



