পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে পর্যটকদের উৎসাহী আগমন: মৌলভীবাজারের চায়ের রাজ্যে বুকিংয়ের ধুম

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে টানা ছুটির আনন্দে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণপ্রেমীরা ছুটে আসছেন প্রকৃতির অপরূপ লীলাভূমি মৌলভীবাজারে। চায়ের রাজধানী খ্যাত শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলায় ইতিমধ্যে পর্যটকদের আগমন শুরু হয়েছে। এবারের ঈদুল ফিতর (সম্ভাব্য ২০-২১ মার্চ) কেন্দ্র করে জেলার হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজগুলোতে বুকিংয়ের চাপ লক্ষণীয়। বিশেষ করে শহরের বাইরের প্রকৃতি-ঘেরা রিসোর্টগুলোতে প্রায় ৯০ শতাংশেরও বেশি কক্ষ আগাম বুক হয়ে গেছে।

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান, এবারের ঈদ ছুটি (সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী ১৭ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত সম্ভাব্য ৭ দিনের ছুটি) প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানোর জন্য আদর্শ। শ্রীমঙ্গলের রাধানগর গ্রাম এলাকায় অবস্থিত প্রায় অর্ধশত রিসোর্ট ও কটেজে ২২ থেকে ২৪ মার্চের তিন দিনের জন্য ৯০ শতাংশ বুকিং সম্পন্ন। অনেক ক্ষেত্রে এই সময়কে ‘পিক টাইম’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের আশা, ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে ততই বুকিং বাড়বে এবং শতভাগ কক্ষ পূর্ণ হয়ে যাবে।

শহরের অভ্যন্তরীণ হোটেলগুলোতে এখনও তুলনামূলক কম চাপ রয়েছে। বেশিরভাগ হোটেলে ৫০-৬০ শতাংশ বা তারও কম বুকিং হয়েছে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, আধুনিক ভ্রমণপ্রেমীরা এখন শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির নিরিবিলি পরিবেশে থাকতে চান। তাই রিসোর্ট ও কটেজের প্রতি ঝোঁক বেশি। শ্রীমঙ্গলে বর্তমানে পাঁচ তারকা মানের রিসোর্টসহ শতাধিক আবাসন রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন সহস্রাধিক পর্যটক থাকতে পারেন।

ঈদ উপলক্ষে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন। অনেক রিসোর্টে আকর্ষণীয় প্যাকেজ, ছাড় ও বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে। রেস্তোরাঁ ও ক্যাফেগুলো নতুন সাজে সজ্জিত। খাবারের মেনুতে যুক্ত হয়েছে বাংলা, চাইনিজ, থাই খাবারের পাশাপাশি স্থানীয় আদিবাসী (খাসিয়া, মণিপুরী, ত্রিপুরা) খাবারের বিশেষ আয়োজন। এতে পর্যটকরা এ অঞ্চলের সংস্কৃতি ও স্বাদের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন।

টিলাগাঁও ইকো ভিলেজের ব্যবস্থাপক মো. সোহেল আহমেদ বলেন, “আমরা পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে ইকো ভিলেজ সাজিয়েছি। ইট-ছন দিয়ে ব্যতিক্রমী ডিজাইনের ঘর, মনোমুগ্ধকর পরিবেশ—এসবই আমাদের আকর্ষণ। ২২ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৯৫ শতাংশ বুকিং হয়েছে। এবার পর্যটক সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করছি।”

চামুং রেস্তোরাঁ অ্যান্ড ইকো ক্যাফের স্বত্বাধিকারী তাপস দাশ জানান, “ঈদে আসা পর্যটকদের জন্য স্থানীয় ও আদিবাসী খাবারের বিশেষ মেনু রাখা হয়েছে। এতে তারা এ অঞ্চলের স্বাদ ও ঐতিহ্য উপভোগ করতে পারবেন।”

বালিশিরা রিসোর্টের পরিচালক জাহানারা আক্তার বলেন, “রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। ২১ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৮০ শতাংশ বুকিং সম্পন্ন। পর্যটক সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল।”

গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফের জেনারেল ম্যানেজার আরমান খান উল্লেখ করেন, “ঈদে বিদেশি পর্যটক কম থাকলেও দেশি পর্যটকের ভিড় হয়। এবারও আমাদের বুকিং প্রায় শতভাগ পূর্ণ।”

মৌলভীবাজার হাওর, পাহাড়, টিলা ও সবুজ চা বাগানে ঘেরা এক অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জেলা। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে পর্যটকের সমাগম সবচেয়ে বেশি। উল্লেখযোগ্য স্পটগুলোর মধ্যে রয়েছে—চা বাগান, হাইল হাওর, বাইক্কার বিল, সাত রঙের চা, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হামহাম জলপ্রপাত, মাধবপুর লেক, খাসিয়া পুঞ্জি, মণিপুরী তাঁতশিল্প, গোলটিলা, হাজমটিলা, শংকর টিলা প্রভৃতি। এসব স্থানে ঈদের ছুটিতে প্রকৃতিপ্রেমীদের ভিড় বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পর্যটকদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ জোনের ওসি মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, “পর্যটন স্পটগুলোতে টহল জোরদার করা হয়েছে। জেলা পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন, র‍্যাব, বিজিবি ও ট্যুরিস্ট পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ নিরাপত্তা কার্যক্রম চলবে। পর্যটকরা যাতে নির্বিঘ্নে আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, সেদিকে সর্বোচ্চ নজর রাখা হচ্ছে।”

এবারের ঈদুল ফিতর মৌলভীবাজারের পর্যটন শিল্পের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ। প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও আতিথেয়তার মিলিত আকর্ষণে এ অঞ্চল ভ্রমণপ্রেমীদের প্রিয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা আশাবাদী যে, এবারের ছুটিতে রেকর্ড সংখ্যক পর্যটকের সমাগম ঘটবে।

প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার

Read Previous

রমজানের নির্জনতায় কক্সবাজার সৈকত: সর্বোচ্চ ছাড় সত্ত্বেও পর্যটকশূন্য বেলাভূমি, ব্যবসায়ীরা অপেক্ষায় ঈদের জোয়ার

Read Next

ঈদের লম্বা ছুটিতে ঢাকার কাছাকাছি ৭টি আদর্শ ডে-আউট স্পট: পরিবারের সঙ্গে স্মরণীয় মুহূর্ত কাটানোর সুযোগ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular