ঈদের লম্বা ছুটিতে ঢাকার কাছাকাছি ৭টি আদর্শ ডে-আউট স্পট: পরিবারের সঙ্গে স্মরণীয় মুহূর্ত কাটানোর সুযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহার মতো উৎসবের সময় বাংলাদেশে সাধারণত ৫-৭ দিনের লম্বা ছুটি পাওয়া যায়। এই সময়ে ঢাকার বাসিন্দারা শহরের যানজট, ধুলো-ধোঁয়া ও ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পেতে চান। কিন্তু দূরের জেলায় যাওয়ার পরিকল্পনা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই ঢাকার আশপাশে অবস্থিত এমন কিছু সুন্দর, নিরাপদ ও বিনোদনমূলক স্থান রয়েছে যেখানে একদিনের ট্রিপ বা ডে-আউট করে পরিবার, বন্ধুবান্ধব বা প্রিয়জনদের সঙ্গে অসাধারণ সময় কাটানো যায়। এই সাতটি গন্তব্য ঈদের ছুটিকে আরও আনন্দময় ও স্মরণীয় করে তুলতে পারে।

প্রথম দিনের বিকেলে শুরু করা যেতে পারে শেফস টেবিল কোর্টসাইড দিয়ে। ইউনাইটেড সিটি, মাদানী এভিনিউতে অবস্থিত এই বিশাল স্পেসটি খাবারপ্রেমী ও ক্রীড়াপ্রেমীদের জন্য একটি অনন্য জায়গা। প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুট এলাকাজুড়ে এখানে রয়েছে ৩৫টিরও বেশি ফুড স্টল, যেখানে চাইনিজ, ইন্ডিয়ান, বাংলাদেশি ও আন্তর্জাতিক খাবারের স্বাদ পাওয়া যায়। শিশুদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে মিনি জাঙ্গলের ট্রি হাউস, স্যান্ড-পিট, এয়ারপ্লেন, পাইরেট শিপসহ নানা আউটডোর অ্যাক্টিভিটি এবং ইনডোর প্লে জোন। খোলা আকাশের নিচে খাবার খাওয়া ও শিশুদের খেলাধুলা দেখতে দেখতে ঈদের প্রথম দিনের ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে। এটি শহরের মধ্যেই অবস্থিত বলে যাতায়াতও সহজ।

দ্বিতীয় দিনে যাওয়া যেতে পারে জিন্দা পার্ক-এ। ৩০০ ফিট রোডের কাছে, ঢাকা থেকে মাত্র ২০-৩০ কিলোমিটার দূরে নারায়ণগঞ্জের এই পার্কটি একটি সবুজ ও শান্ত স্পট। বিশাল এলাকাজুড়ে লেক, সবুজ মাঠ ও নান্দনিক গ্রাম্য পরিবেশ রয়েছে। পিকনিকের জন্য আদর্শ এই জায়গায় নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশে শিশু থেকে বয়স্ক সবাই সময় কাটাতে পারেন। প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ১৫০ টাকা (ঈদের সময় কিছুটা বেশি হতে পারে), শিশুদের জন্য ৫০ টাকা। বাইরের খাবার নিয়ে যাওয়া যায় না, তবে ভেতরে খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। পার্কটি সকাল ৭টা থেকে মাগরিব পর্যন্ত খোলা থাকে।

তৃতীয় দিনে উদয়পুর ডেস্টিনেশন আপনাকে দিতে পারে প্রকৃতির শান্তি। গুলশানের কাছাকাছি, মাদানী এভিনিউয়ের ১০০ ফিট রোডের পাশে অবস্থিত এই স্থানটি খুবই কাছে—মাত্র ৭ কিলোমিটার আমেরিকান এম্বাসি থেকে। বিশাল সবুজ মাঠ, শান্ত জলাধার, খোলা আকাশ ও সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ এখানকার প্রধান আকর্ষণ। সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের দৃশ্য অসাধারণ। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে শান্ত সময় কাটানোর পাশাপাশি ক্যান্ডেল লাইট ডিনার বা ছোট আয়োজনের ব্যবস্থা রয়েছে।এটি একটি রিসোর্ট-স্টাইলের জায়গা যেখানে তাজা বাতাস ও প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়া যায়।

অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য চতুর্থ দিনে এয়ার ফোর্স বেসক্যাম্প একটি দারুণ অপশন। ঢাকার ভেতরেই অবস্থিত এই স্থানে রয়েছে ট্রি-টপ অ্যাক্টিভিটি, ক্লাইম্বিং ওয়াল, জিপ লাইনিং, ক্যাম্পিং টেন্ট, ইয়োগা ও মেডিটেশন সেন্টার। শিশুদের জন্য আলাদা প্লে জোন ও আর্চারির ব্যবস্থা রয়েছে। প্যাকেজ মূল্য ৪০০ টাকা থেকে শুরু, এবং মেট্রোরেল দিয়ে সহজেই পৌঁছানো যায়। ফ্যামিলি এস্কেপ প্যাকেজে ৩ ঘণ্টায় জিপলাইন, ট্রিটপ, আর্চারি ইত্যাদি উপভোগ করা যায়। এটি শহুরে অ্যাডভেঞ্চারের জন্য আদর্শ।

পঞ্চম দিনে নদীপ্রেমীদের জন্য মাওয়া ঘাট। ঢাকা থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত এই জায়গাটি রোড ট্রিপের জন্য চমৎকার। পদ্মা সেতুর নিচ দিয়ে ফেরি যাত্রা বা নদীর ধারে বসে তাজা ইলিশ মাছের স্বাদ নেওয়া যায়। ইলিশ ভাজা, ভর্তা, লেজ ভর্তা, গরম ভাত—মাছপ্রেমীদের জন্য এটি স্বর্গসম। নদীর হাওয়া ও দৃশ্য অভিজ্ঞতা অসাধারণ। অনেক রেস্তোরাঁয় তাজা মাছ কিনে রান্না করিয়ে খাওয়া যায়।

ষষ্ঠ দিনে ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য পানাম নগর। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত এই প্রাচীন নগরী ঢাকা থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে। উনিশ শতকের হিন্দু বণিকদের বসতি এখন পরিত্যক্ত, কিন্তু পুরোনো স্থাপত্য, নির্জন রাস্তা ও সময়ের ছাপ পড়া দেয়াল দেখে ইতিহাসের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। সোনারগাঁও ফোক অ্যান্ড হ্যান্ডিক্রাফট মিউজিয়ামের সঙ্গে মিলিয়ে একদিনের ট্রিপ করা যায়। এটি একটি জীবন্ত ঐতিহাসিক অধ্যায়।

সপ্তম দিনে প্রকৃতির কোলে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান। ঢাকা থেকে প্রায় ৪০-৫০ কিলোমিটার উত্তরে গাজীপুরে অবস্থিত এই উদ্যানে উঁচু শালগাছের বন, শান্ত পরিবেশ ও বিশাল খোলা জায়গা রয়েছে। পিকনিক, হাঁটাহাঁটি বা প্রকৃতি উপভোগের জন্য নিখুঁত। শীতকালে বিশেষ সুন্দর লাগে, তবে ঈদের সময়ও সবুজের সমারোহ থাকে।

এই সাতটি গন্তব্যে গিয়ে ঈদের ছুটিকে প্রকৃতি, অ্যাডভেঞ্চার, ইতিহাস, সুস্বাদু খাবার ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর এক অনন্য মিশ্রণে রাঙিয়ে তোলা যায়। যাতায়াত সহজ, খরচ কম এবং অভিজ্ঞতা অসাধারণ—এমন স্থানগুলো ঢাকাবাসীর জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। ঈদের এই ছুটিতে শহর ছেড়ে এই স্পটগুলোতে ঘুরে আসুন, নতুন স্মৃতি তৈরি করুন। শুভ ঈদ!

Read Previous

পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে পর্যটকদের উৎসাহী আগমন: মৌলভীবাজারের চায়ের রাজ্যে বুকিংয়ের ধুম

Read Next

যুক্তরাষ্ট্রের বি১/বি২ ভিজিটর ভিসায় ‘বার্থ ট্যুরিজম’ নিষিদ্ধ ঘোষণা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular