
ছবি: সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : দুবাই এক্সপো সিটির আকাশ আবারও ব্যস্ত। বিশ্বের শীর্ষ বিমান নির্মাতা, প্রতিরক্ষা খাতের জায়ান্ট, স্টার্টআপ, গবেষক আর ভবিষ্যতমুখী উদ্ভাবকরা একসঙ্গে জড়ো হয়েছেন বছরের অন্যতম বড় বিমান ও মহাকাশ প্রদর্শনী দুবাই এয়ারশো ২০২৫–এ। ১৭ নভেম্বর শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী চলবে পাঁচ দিন, যেখানে অংশ নিচ্ছে ১,৫০০–এর বেশি আন্তর্জাতিক কোম্পানি, শত শত বিমান, মহাকাশ সংস্থা এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা উদ্ভাবকরা।
এবারের থিম ‘ভবিষ্যৎ এখানে’—আর সত্যি বলতে কী, দুবাইয়ের এই বিশাল আয়োজন সেই বাক্যকে যথার্থ অর্থেই তুলে ধরছে। শুধু বিমানের প্রদর্শনী নয়, এবার পুরো অনুষ্ঠানটা যেন ভবিষ্যতের উড়ান, স্মার্ট প্রযুক্তি, টেকসই জ্বালানি আর নগর আকাশ পরিবহনের নতুন অধ্যায়ের দরজা খুলে দিচ্ছে।
আয়োজনের পরিধি: আগের সব রেকর্ড ভেঙে
দুবাই ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল (DWC)–এ অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে উপস্থিতির সংখ্যা দেখলেই বোঝা যায় বিষয়টা কতটা বড়সড়।
- ১,৫০০–এর বেশি প্রদর্শক
- ৪৪০ নতুন প্রতিষ্ঠান
- ১ লক্ষ ৪৮ হাজারের বেশি বাণিজ্যিক দর্শনার্থী
- ৪৯০ সামরিক ও বেসামরিক প্রতিনিধি
- ২১টি দেশের জাতীয় প্যাভিলিয়ন
- ২০০–এর বেশি উড়োজাহাজ প্রদর্শনীতে
- ১২০টি স্টার্টআপ ও ৫০–এর বেশি বিনিয়োগকারী
এবার প্রথমবারের মতো প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছে মরক্কোসহ কয়েকটি নতুন দেশ। প্রদর্শনী এলাকার বিস্তার বাড়ানো হয়েছে আরও ৮,০০০ বর্গমিটার, যা নিজেই বলে দিচ্ছে অংশগ্রহণ কতটা বেড়েছে।
উড়ান প্রদর্শনীতে থাকছে বাণিজ্যিক জেট, সামরিক বিমান, কার্গো উড়োজাহাজ, ব্যক্তিগত জেট, অমানবিক বিমান (UAV), এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয়—ভবিষ্যতের উড়ানযান eVTOL।
eVTOL–এর প্রথম উড়ান: নগর পরিবহনের নতুন ধাপ
eVTOL মানে Electric Vertical Take-Off and Landing। ভবিষ্যতের শহরগুলো যে আকাশপথে চলবে, সেই ইঙ্গিত বহুদিন ধরেই দিচ্ছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো।
কিন্তু দুবাই এয়ারশো ২০২৫–এ প্রথমবার এই বৈদ্যুতিক আকাশযানের লাইভ উড়ান দেখানো হচ্ছে। জবি এভিয়েশনের eVTOL বিমান এবার দর্শনার্থীদের সামনে উড়বে।
এটা শুধু প্রদর্শনী নয়—এটা বার্তা, যে ভবিষ্যতের শহরের পরিবহন মাটির উপর নয়, আকাশে তৈরি হবে। এবং দুবাই সেই পথে সবচেয়ে দ্রুত এগোচ্ছে।
দুবাই সিভিল এভিয়েশন অথরিটির প্রধান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ লেঙ্গাউই বলেছেন, এই প্রদর্শনী শুধু নতুন প্রযুক্তি দেখানো নয়, বরং নগর বিমান চলাচলের ভবিষ্যৎ বাস্তবে কেমন হবে, তার একটা ঝলক দেখানোর সুযোগ।
মহাকাশ প্যাভিলিয়ন: ভবিষ্যৎ অনুসন্ধানের নতুন দরজা
এবারের এয়ারশোয়ের একটি বড় আকর্ষণ হলো দুবাইয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মহাকাশ প্যাভিলিয়ন, যা আয়োজন করছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্পেস এজেন্সি।
এখানে অংশ নিচ্ছে—
- শীর্ষ মহাকাশ সংস্থাগুলো
- আন্তর্জাতিক গবেষক
- স্টার্টআপ
- বিনিয়োগকারী দল
- বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা
দুই দিনের মহাকাশ সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন ৫০–এর বেশি মহাকাশ বিশেষজ্ঞ ও মহাকাশচারী, যেখানে আলোচনার কেন্দ্র—দায়িত্বশীল মহাকাশ ব্যবহার, ভবিষ্যতের অনুসন্ধান মিশন, এবং উন্নত মহাকাশ প্রযুক্তির প্রয়োগ।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্পেস এজেন্সির চেয়ারম্যান ড. আহমেদ বেলহুল আল ফালাসির ভাষায়, দেশের মহাকাশ স্বপ্ন এখন শুধু পরিকল্পনার কাগজে নেই—এটা বাস্তব অর্জন।
প্রতিরক্ষা খাতের উপস্থিতি: প্রযুক্তি, শক্তি ও কৌশলের একত্র প্রদর্শনী
প্রতিরক্ষা খাতে দুবাই সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর এই এয়ারশোতে রয়েছে—
- অভিজাত আন্তর্জাতিক অ্যারোবেটিক দল
- সামরিক উড়োজাহাজের উড়ান
- প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির প্রদর্শনী
- উন্নত সেন্সর এবং স্টেলথ সিস্টেম
সংযুক্ত আরব আমিরাত উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনাকে এখানে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরছে।
নতুন সম্মেলন ট্র্যাক: শিল্পের পরবর্তী অধ্যায়কে সামনে আনা
এবারের এয়ারশোতে ১২টি সম্মেলন ট্র্যাক রাখা হয়েছে, যেখানে ৪৫০–এর বেশি স্পিকার নানা ভবিষ্যতমুখী বিষয়ে আলোচনা করবেন।
নতুন যুক্ত হওয়া ট্র্যাকগুলোর মধ্যে আছে:
- উন্নত এয়ার মোবিলিটি
- যাত্রী অভিজ্ঞতার ভবিষ্যৎ
- সাইবার নিরাপত্তা
- বিমানবন্দর ও এয়ারলাইন কীনোট
- কর্মশক্তি উন্নয়ন
- স্মার্ট প্রযুক্তি
দুবাই বিমানবন্দরের সিইও পল গ্রিফিথস মনে করেন, ডিজিটাল রূপান্তর আর টেকসই অপারেশন আগামী দশকের বিমান শিল্পকে পুরোপুরি বদলে দেবে। আর এই এয়ারশো সেই পরিবর্তনের নকশা তৈরি করছে।
টেকসইতার দিকে বড় পদক্ষেপ
এবারের এয়ারশো একদম স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে—বিমানের ভবিষ্যৎ শুধু গতির বা বিলাসের নয়, টেকসইতারও।
কিছু উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ:
- অংশগ্রহণকারী বিমানে সাস্টেইনেবল এভিয়েশন ফুয়েল (SAF) ব্যবহার
- প্রদর্শনীতে ইলেকট্রিক ও প্রোপেন চালিত গ্রাউন্ড ইকুইপমেন্ট
- পুরো প্রদর্শনী এলাকা ১০০% নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ দ্বারা চালিত
- পুনর্ব্যবহারযোগ্য স্ট্যান্ড ডিজাইনের প্রচারণা
- পানি পুনঃব্যবহার ও হাইড্রেশন স্টেশন
- পরিবেশবান্ধব আবাসন ব্যবস্থা
সোজা কথায়, দুবাই শুধু প্রযুক্তি দেখাচ্ছে না, দায়িত্বশীল ভবিষ্যতের বার্তাও দিচ্ছে।
ইনস্পিরেশন জোন, স্টার্টআপ হাব ও নেক্সটজেন লিডার্স
দুবাই এয়ারশো শুধু প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানকে নয়, নতুনদেরও বড় সুযোগ দিচ্ছে।
- ইনস্পিরেশন জোন: নতুন ধারণা উপস্থাপনার জায়গা
- স্টার্টআপ হাব: উদ্ভাবনী স্টার্টআপ ও বিনিয়োগকারীদের মিলনমঞ্চ
- নেক্সটজেন লিডার্স: বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষকদের প্রকল্প প্রদর্শন
এগুলো দেখলেই বোঝা যায়, দুবাই শুধু বর্তমান নয়—ভবিষ্যতের প্রতিভা ও উদ্ভাবনকেও অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
সন্ধ্যার নতুন আয়োজন: আকাশ, আলো আর বিনোদনের সমাহার
এবার প্রথমবার দুবাই এয়ারশো রাত পর্যন্ত চলবে।
রয়েছে—
- স্কাইডাইভ দুবাইতে বিশেষ পার্টি
- এয়ারশো আফটার ডার্ক
- ড্রোন শো
- লাইভ মিউজিক
- খাবারের ট্রাক
- ভিআইপি ভিউয়িং জোন
যারা বিমান ভালোবাসেন না, তারাও এই অংশ মিস করতে চাইবেন না।
স্কাইভিউ গ্র্যান্ডস্ট্যান্ড: জনসাধারণের জন্য চমৎকার অভিজ্ঞতা
সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য স্কাইভিউ গ্র্যান্ডস্ট্যান্ড আলাদা আকর্ষণ।
এখানে দেখা যাবে—
- শীর্ষ আন্তর্জাতিক অ্যারোবেটিক দল
- আকাশে জটিল ও রোমাঞ্চকর কসরত
- স্ট্যাটিক ও ফ্লায়িং ডিসপ্লে
- পাইলটের সঙ্গে আলাপ
- পরিবারবান্ধব নানা অনুষ্ঠান
এক কথায়, এটা পুরো উৎসবের প্রাণ।
দুবাই এয়ারশো ২০২৫ শুধু একটা প্রদর্শনী নয়—এটা航空 ও মহাকাশ খাতের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তার বাস্তব চিত্র। নগর বিমান চলাচল থেকে মহাকাশ গবেষণা, টেকসই জ্বালানি থেকে স্মার্ট প্রযুক্তি—সবকিছুরই পরিষ্কার দিক নির্দেশনা মেলে এখানে।
দুবাই আবারও প্রমাণ করল, ভবিষ্যৎকে শুধু অপেক্ষা করে দেখা নয়; বরং সেটা নিজ হাতে তৈরি করতে হয়। আর এই এয়ারশো সেই অভিযাত্রারই প্রতিচ্ছবি।



