ঢাকায় বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩: বৈশাখী মেলায় পর্যটকদের জন্য ঐতিহ্য, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক সম্মিলনের উৎসব

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : বাংলা বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ বাঙালি জাতির কাছে শুধু একটি তারিখ নয়, বরং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ ও সম্প্রীতির প্রতীক। প্রতি বছর জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে এই দিনটি উদযাপন করে। ২০২৬ সালের বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩-এ ঢাকা শহর হয়ে উঠেছে বৈশাখী মেলার প্রাণকেন্দ্র। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে আয়োজিত এসব মেলা শুধু স্থানীয়দের জন্য নয়, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্যও এক অনন্য আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঐতিহ্যবাহী খাবার, হস্তশিল্প, লোকসংগীত, নাগরদোলা ও আধুনিক বিনোদনের মিশেলে এই মেলাগুলো পর্যটনের নতুন মাত্রা যোগ করছে।

ঢাকার উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সরাসরি কোনো কেন্দ্রীয় আয়োজনের তথ্য না দিলেও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সূত্রে জানা যায় যে, এবার রাজধানীজুড়ে একাধিক বৈশাখী মেলা বসছে। এগুলো পর্যটকদের জন্য বিশেষভাবে আকর্ষণীয় কারণ এখানে বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক শহুরে বিনোদনের সমন্বয় ঘটেছে।

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ১৪ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হবে। এখানে কুটিরশিল্প, হস্তশিল্পের পসরা, দেশি খাবারের স্টল, নাগরদোলা ও পুতুলনাচের আয়োজন থাকবে। পর্যটকরা এখানে এসে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির স্বাদ নিতে পারবেন। বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকদের জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান, যেখানে তারা বাঙালি ঐতিহ্যের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হতে পারবেন।

গুলশানের আলোকিতে ১৩-১৪ এপ্রিল ‘অর্ক বৈশাখ ১৪৩৩’ উৎসব আয়োজিত হবে। সঙ্গীত, শিল্পকলা, খাদ্য ও সম্প্রদায়ের সমন্বয়ে এই উৎসব নতুন প্রজন্মের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য একটি আধুনিক ও প্রাণবন্ত অভিজ্ঞতা হবে। গুলশানের মতো আধুনিক এলাকায় এমন আয়োজন শহুরে পর্যটনের সঙ্গে সাংস্কৃতিক পর্যটনের মিশেল ঘটাচ্ছে।

পুরান ঢাকার চকবাজার, ঠাটারি বাজার ও নাজিরাবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে ঐতিহ্যবাহী মেলা বসবে। এখানে পুরোনো ঢাকার সেই চিরায়ত আমেজ অনুভব করাযাবে। পর্যটকরা ঘুরে ঘুরে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন, পান্তা-ইলিশের স্বাদ নিতে পারবেন এবং পুরানো স্থাপত্যের সঙ্গে মেলার রঙিন পরিবেশ উপভোগ করতে পারবেন। পুরান ঢাকার এই মেলাগুলো হেরিটেজ পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকায় ১৪ এপ্রিল উইন্টার গার্ডেন ও রূপসী বাংলা গ্র্যান্ড বলরুমে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। নাচ, গান, নাগরদোলা, চু চু ট্রেন, ফান রাইডস, ম্যাজিক শো, ফেস পেইন্টিংসহ নানা আকর্ষণ থাকবে। বৈশাখী খাবারের সমৃদ্ধ বুফে তো থাকছেই। প্রতিজনের প্রবেশমূল্য ২৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি লাক্সারি পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ, যেখানে পাঁচ তারকা হোটেলের আরামের সঙ্গে বৈশাখী উৎসবের মিশেল পাওয়া যাবে।

মিরপুরের দ্য রিভার এজ রেস্তোরাঁয় ১২ থেকে ১৫ এপ্রিল চার দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা চলবে। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরে আসার জন্য এটি একটি সুবিধাজনক স্থান।

আগারগাঁওয়ের এয়ার ফোর্স বেইজক্যাম্পে ১৪ এপ্রিল দিনব্যাপী (সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা) বৈশাখী মেলা আয়োজিত হচ্ছে। এখানে বায়োস্কোপ, মেহেদি উৎসব, ফেস পেইন্ট, ক্যারিকেচার, বাউল গান, পটারি হুইলের পাশাপাশি লাটিম, মার্বেল, সাতচারা, দাঁড়িয়াবান্ধা, চোঙা ফোন, রণপা, লুডু-ক্যারামের মতো ঐতিহ্যবাহী খেলার আয়োজন থাকবে। বাঙালি খাবারের স্ট্রিট ফুড কর্নারে ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, হাওয়াই মিঠাইসহ নানা সুস্বাদু খাবার পাওয়া যাবে। এয়ার ফোর্স বেইজক্যাম্পের অ্যাডভেঞ্চার আকর্ষণগুলো যোগ করে এটিকে পর্যটকদের জন্য একটি অনন্য অ্যাডভেঞ্চার-কালচারাল মিক্সচার করে তুলেছে।

বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র, আগারগাঁওয়ে এসএমই ফাউন্ডেশনের আয়োজনে ৯ থেকে ১৪ এপ্রিল (কিছু সূত্রে ১২-১৮ এপ্রিল) ছয় থেকে সাত দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা চলবে। এখানে ৩০০-এর বেশি দেশীয় পণ্যের স্টল থাকবে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দেড় লাখেরও বেশি লোকের সমাগমের আশা করা হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির এই মেলা শপিং পর্যটনের একটি বড় সুযোগ তৈরি করছে। পর্যটকরা এখান থেকে হস্তশিল্প, পোশাক, খাবারসহ নানা স্মারক কিনে নিয়ে যেতে পারবেন।

এছাড়া ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর, হাতিরঝিলসহ অন্যান্য স্থানেও বৈশাখী আমেজ ছড়িয়ে পড়বে। হাতিরঝিলে নৌকা ভ্রমণ, আলোকসজ্জা ও ঘোরাঘুরি পর্যটকদের জন্য অতিরিক্ত আকর্ষণ যোগ করবে।

বৈশাখী মেলাগুলো শুধু উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এগুলো বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকেনতুন করে চাঙ্গা করছে। দেশি পর্যটকরা যেমন পরিবার নিয়ে বিনোদন পাচ্ছেন, তেমনি বিদেশি পর্যটকরা বাংলার সংস্কৃতি, খাবার ও ঐতিহ্যের স্বাদ নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এই মেলাগুলো অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ—উদ্যোক্তাদের পণ্য বিক্রি, হোটেল-রেস্তোরাঁর ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ উপলক্ষে ঢাকায় আসা পর্যটকদের জন্য পরামর্শ—সকালে রমনা বটমূল বা চারুকলায় মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিন, দুপুরে ঐতিহ্যবাহী মেলায় ঘুরুন, বিকেলে আধুনিক আয়োজনে যোগ দিন এবং সন্ধ্যায় হাতিরঝিল বা লেক এলাকায় আলোকসজ্জা উপভোগ করুন। নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে এই উৎসব আরও আনন্দময় হয়ে উঠবে।

বাংলা নববর্ষের এই বর্ণিল আয়োজন ঢাকাকে পর্যটনের একটি জীবন্ত ক্যানভাসে পরিণত করেছে। এসো হে বৈশাখ—এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে পর্যটকরা যেন বাংলার প্রাণের স্পন্দন অনুভব করতে পারেন।

প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ

Read Previous

ভারতের ভিসা পুনরায় চালুর জন্য জোরালো চাপ দিচ্ছে ঢাকা

Read Next

সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী গ্রেপ্তার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular