ভারতের ভিসা পুনরায় চালুর জন্য জোরালো চাপ দিচ্ছে ঢাকা

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন করে সাজানোর লক্ষ্যে ভারতীয় ভিসা পরিষেবা—বিশেষ করে পর্যটন ও চিকিৎসা ভিসা—পুনরায় পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার জন্য জোরালো অনুরোধ জানাবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের আসন্ন নয়াদিল্লি সফরকে কেন্দ্র করে এই আশা প্রকাশ করা হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তারা মনে করছেন, ভিসা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হলে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বল্প-দূরত্বের ভ্রমণ করিডোর পুনরুজ্জীবিত হবে, যা উভয় দেশের অর্থনীতি, বিমান চলাচল, হাসপাতাল ও পর্যটন খাতকে ব্যাপকভাবে উপকৃত করবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রী খলিলুর রহমান মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) নয়াদিল্লির উদ্দেশে রওনা হবেন। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শুভেচ্ছা সফর’ হলেও, বাস্তবে এতে বিমান চলাচল সংযোগ, আন্তঃসীমান্ত ভ্রমণ প্রবাহ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো বাস্তবমুখী ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সফরের মূল ফোকাসে থাকবে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতের পর্যটন ভিসার দীর্ঘদিনের স্থগিতাদেশ। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে এই ভিসা সেবা সীমিত বা স্থগিত রাখা হয়েছে, যার ফলে ঢাকা-দিল্লি, ঢাকা-কলকাতাসহ অন্যান্য রুটে যাত্রী সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ পর্যায়ক্রমে বা সম্পূর্ণভাবে ভিসা পরিষেবা পুনরায় চালুর জন্য চাপ দেবে। তারা বিশেষ করে চিকিৎসা পর্যটনের বিষয়টি তুলে ধরবেন। দীর্ঘদিন ধরে ভারত বাংলাদেশি রোগীদের জন্য একটি জনপ্রিয় গন্তব্য। কলকাতা, চেন্নাই, বেঙ্গালুরুসহ বিভিন্ন শহরের হাসপাতালগুলোতে বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে যান। এই খাত থেকে ভারত বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। ভিসা সুবিধা পুনরায় চালু হলে শুধু চিকিৎসা পর্যটন নয়, সাধারণ পর্যটন, ব্যবসায়িক ভ্রমণ এবং ছোটখাটো বাণিজ্যও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভিসা সংকটের কারণে বিমান সংস্থাগুলোর রাজস্ব কমেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটগুলোতে যাত্রী সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ভিসা পুনরায় চালু হলে অবিলম্বে চাহিদা বাড়বে এবং ঢাকা-কলকাতা, ঢাকা-দিল্লি রুটে অতিরিক্ত ফ্লাইট চালু করার সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে হোটেল, পর্যটন গাইড, পরিবহন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো উপকৃত হবে। বাংলাদেশের প্রবাসী ও ছাত্র-পণ্ডিত সম্প্রদায়ও এই সুবিধার অপেক্ষায় রয়েছে।

সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারতের বিদেশমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। এছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিকগ্যাস মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীর সঙ্গেও বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। আলোচনায় ভিসা ইস্যুর পাশাপাশি বিমান চলাচল সংযোগ বৃদ্ধি, ভ্রমণ-সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা হ্রাস, স্থিতিশীল সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য সুবিধা, জ্বালানি সহযোগিতা এবং পানি বণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উঠে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে মানুষ ও পণ্যের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর উভয় পক্ষই সম্পর্ককে নতুন করে সাজাতে আগ্রহী। এই সফরটি সেই প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে। কর্মকর্তারা মনে করেন, ভিসা সেবা পুনরায় চালু হলে শুধু অর্থনৈতিক লাভই নয়, দুই দেশের জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও মানবিক যোগাযোগও বৃদ্ধি পাবে।

সফর শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ১০ থেকে ১২ এপ্রিল মরিশাসের পোর্ট লুইসে অনুষ্ঠিতব্য ভারত মহাসাগর সম্মেলনে যোগ দেবেন। এই সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ভিসা পুনরায় চালুর বিষয়টি যদি সফল হয়, তাহলে বাংলাদেশের পর্যটন ও চিকিৎসা খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে ভারতের পর্যটন-নির্ভর অঞ্চলগুলোও অতিরিক্ত রাজস্বের সুযোগ পাবে। উভয় দেশের বিমান সংস্থা, হোটেল শিল্প এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা এই ইতিবাচক পরিবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন। আলোচনার ফলাফল কী হয়, তা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হবে।

Read Previous

বোয়িংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট পল রিঘির সঙ্গে বৈঠক: বাংলাদেশ ন্যারো-বডি বিমান লিজ নেওয়ার সম্ভাবনা ত্বরান্বিত করবে

Read Next

ঢাকায় বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩: বৈশাখী মেলায় পর্যটকদের জন্য ঐতিহ্য, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক সম্মিলনের উৎসব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular