
ছবি : সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ডেনমার্ক এমন এক দেশ যেখানে আধুনিকতা আর পুরনো ইউরোপীয় স্থাপত্য মিশে যায় অনায়াসে। কোপেনহেগেনের রঙিন নয়া বন্দর, টিভোলি গার্ডেন, অমলিন প্রকৃতি—সব মিলিয়ে ভ্রমণ প্রেমীদের জন্য ডেনমার্ক দুর্দান্ত একটি গন্তব্য। কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে হলে প্রথম ধাপ হলো শেঙ্গেন ভিসা পাওয়া। ডেনমার্ক শেঙ্গেন অঞ্চলের সদস্য, তাই একবার ভিসা পেলে শুধু ডেনমার্ক নয়, ইউরোপের আরও ২৬টি দেশে ঘুরে বেড়ানো সম্ভব।
এখন প্রশ্ন—এই ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া কেমন? চলুন ধাপে ধাপে দেখে নেওয়া যাক।
কেন ডেনমার্ক শেঙ্গেন ভিসা গুরুত্বপূর্ণ
শেঙ্গেন ভিসা মূলত একটি মাল্টি-কান্ট্রি এন্ট্রি পাস। ডেনমার্কের পর্যটন ভিসা মানে শেঙ্গেন শর্ট-স্টে ভিসা (টাইপ C)। ভ্রমণকারীরা সর্বোচ্চ ৯০ দিন শেঙ্গেন অঞ্চলে থাকতে পারেন। সে কারণে কাগজপত্র যাচাই খুবই কঠোর। উদ্দেশ্য একটাই—আপনি ঘুরে-ফিরে নির্ধারিত সময়ে নিজের দেশে ফিরে যাবেন কি না, সেটার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দেওয়া।
কী কী প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস লাগে
এখানেই বেশিরভাগ আবেদনকারী পরীক্ষা দেয়। কারণ ডেনমার্ক, অন্যান্য শেঙ্গেন রাষ্ট্রের মতোই, পরিষ্কার, সম্পূর্ণ, এবং প্রমাণযোগ্য ডকুমেন্টেশন চায়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রগুলো হলো—
১. ভিসার আবেদন ফর্ম
অনলাইনে পূরণ করতে হয়। ফর্মে ব্যক্তিগত তথ্য, ভ্রমণের উদ্দেশ্য, অবস্থানকাল, স্পনসরশিপ থাকলে সেটা উল্লেখ করতে হয়।
২. পাসপোর্ট
- অন্তত দুইটি খালি পৃষ্ঠা থাকতে হবে
- বৈধতা কমপক্ষে ৬ মাস
- আগের ভিসাগুলো থাকলে সেগুলোও জমা দিতে হয়
৩. দুটি সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজ ছবি
শেঙ্গেন নিয়ম অনুযায়ী সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড, নির্দিষ্ট আকার, মুখ পরিষ্কারভাবে দেখা যেতে হবে।
৪. কভার লেটার
এটা আপনার মৌখিক সাক্ষাৎকারের জায়গা পূরণ করে। সেখানে দেখাতে হয় কেন যাচ্ছেন, কতদিন থাকবেন, নিজের খরচ নিজে বহন করবেন কি না, আর দেশে ফেরার নিশ্চয়তা কী।
৫. ভ্রমণ পরিকল্পনা (Itinerary)
- ফ্লাইট বুকিং (টিকেট কিনতে হয় না, শুধু রিজার্ভেশন যথেষ্ট)
- হোটেল বুকিং
- দিনভিত্তিক ভ্রমণ সূচি থাকলে আরও ভালো
৬. ভ্রমণ স্বাস্থ্য বীমা
শেঙ্গেন ভিসার বাধ্যতামূলক শর্ত।
- সর্বনিম্ন কভারেজ: €30,000
- পুরো শেঙ্গেন এলাকায় কার্যকর হতে হবে
৭. ব্যাংক স্টেটমেন্ট (সর্বশেষ ৬ মাসের)
এটাই ভিসা অফিসের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি।
- নিয়মিত লেনদেন
- স্থায়ী আয়
- পর্যাপ্ত ব্যালেন্স
সাধারণ হিসাব অনুযায়ী ডেনমার্ক ভ্রমণের জন্য ২–৩ লাখ টাকা বা তার বেশি সেভিংস থাকা বাঞ্ছনীয়।
৮. সেলারি স্লিপ (কর্মরত হলে)
সাধারণত শেষ ৩ মাসের বেতন স্লিপ দিতে হয়।
৯. এনওসি / চাকরির প্রমাণপত্র
- আপনি চাকরিতে আছেন
- নির্দিষ্ট সময়ের ছুটি পেয়েছেন
- আপনার প্রতিষ্ঠান জানে যে আপনি বিদেশ ভ্রমণে যাচ্ছেন
১০. ব্যবসার ডকুমেন্টস (ব্যবসায়ী হলে)
- ট্রেড লাইসেন্স
- ব্যাঙ্ক সলভেন্সি সার্টিফিকেট
- ব্যবসার লেনদেনের হিসাব
১১. স্পনসরশিপ লেটার (প্রযোজ্য হলে)
বাংলাদেশ বা ডেনমার্কে কোনো ব্যক্তি খরচ বহন করলে তা উল্লেখ করে নথি দিতে হবে।
১২. পারিবারিক-সম্পর্কের প্রমাণ
- বিবাহ সনদ
- সন্তানের জন্মসনদ
এসব নথি দেশে ফেরার সম্ভাবনা বাড়ায়।
ভিসা ফি কত
ডেনমার্ক ভিসার ফি সাধারণ শেঙ্গেন রেট অনুযায়ী হয়ে থাকে।
সাধারণ কাঠামো হলো—
- ভিসা ফি: প্রায় ৮০ ইউরো
- বাংলাদেশে প্রায় ১০,০০০–১১,০০০ টাকা সমান
- এছাড়া VFS সার্ভিস চার্জ যুক্ত হয় (সাধারণত ৩০০০–৩৫০০ টাকা)
পরিবর্তন হতে পারে, তাই আবেদন জমা দেওয়ার আগে VFS-এর ওয়েবসাইট দেখে নেওয়া ভালো।
কোথায় আবেদন জমা দিতে হয়
বাংলাদেশে ডেনমার্কের এম্বাসির ভিসা কার্যক্রম VFS Global পরিচালনা করে। সব আবেদন VFS ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারে জমা দিতে হয়।
VFS Global – Denmark Visa Application Center, Dhaka
- ঠিকানা: Plot 76 & 76A, Road 11, Block M, Banani, Dhaka
- সময়: সাধারণত সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা
- বায়োমেট্রিক দেওয়া বাধ্যতামূলক
- অ্যাপয়েন্টমেন্ট আগেই বুক করতে হয়
ডেনমার্ক দূতাবাস নিজে ভিসা গ্রহণ করে না, শুধু সিদ্ধান্ত দেয়।
ভিসা প্রক্রিয়ার ধাপগুলো
চলুন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো যাত্রাটা একটু গুছিয়ে দেখি।
ধাপ ১: অনলাইনে ফর্ম পূরণ
ডেনমার্ক ভিসার ওয়েবসাইটে গিয়ে আবেদন ফর্ম পূরণ করতে হয়। সেখানে ভ্রমণের উদ্দেশ্য, তারিখ, ব্যক্তিগত তথ্য সব দিতে হয়।
ধাপ ২: ভিসা ফি অনলাইনে পরিশোধ
ফর্ম জমা দেওয়ার পর অনলাইনে ফি পরিশোধ করতে হবে।
ধাপ ৩: VFS-এ অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিং
অনলাইনে সময় ঠিক করে নিতে হয়—কোন দিন বায়োমেট্রিক দেবেন এবং কাগজপত্র জমা দেবেন।
ধাপ ৪: কাগজপত্র জমা ও বায়োমেট্রিক
VFS অফিসে গিয়ে—
- পাসপোর্ট জমা
- ছবি
- বায়োমেট্রিক (ফিঙ্গারপ্রিন্ট + ছবি)
- সব ডকুমেন্টস হস্তান্তর
ধাপ ৫: আবেদন ডেনমার্ক এম্বাসিতে পাঠানো
VFS সব কাগজপত্র যাচাই করে দূতাবাসে পাঠায়।
ধাপ ৬: ভিসা সিদ্ধান্ত
সাধারণত ১৫–৪৫ কর্মদিবস সময় লাগে।
সিজন অনুযায়ী সময় বেশি লাগতে পারে।
ধাপ ৭: পাসপোর্ট সংগ্রহ
VFS থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হয়, অথবা কুরিয়ার সার্ভিস নেওয়া যায়।
ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ানোর কিছু বাস্তব পরামর্শ
অনেকেই হঠাৎ আবেদন করে ফেলেন এবং মনে করেন পর্যাপ্ত ব্যালেন্স থাকলেই ভিসা পাওয়া নিশ্চিত। আসলে সিদ্ধান্তটা আসে সামগ্রিক যাচাইয়ের ওপর। কয়েকটি বিষয় আলাদা করে গুরুত্ব পায়—
১. স্থিতিশীল আয়
হঠাৎ বড় অংকের টাকা জমা রাখলে সেটা সন্দেহজনক মনে হয়।
২. দেশে ফেরার নিশ্চয়তা
- চাকরি
- ব্যবসা
- পরিবার
- মালিকানা সম্পত্তি
এসব প্রমাণ অনেক সাহায্য করে।
৩. পরিষ্কার ভ্রমণ ইতিহাস
যদি আগেই কোথাও ভ্রমণ করে থাকেন (এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্য), সেটা বাড়তি পয়েন্ট।
৪. সঠিক তথ্য
ফর্মে বা কাগজপত্রে ভুল তথ্য দিলে আবেদন বাতিল হওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা।
ডেনমার্ক ভ্রমণ কেমন হতে পারে
ভিসা হাতে পাওয়ার পর ভ্রমণটা সত্যিই উপভোগ্য হয়। কোপেনহেগেনের সরু গলি, সাইকেল সংস্কৃতি, হারবিনজার স্ট্রিটের কফিশপ, শহরের শান্ত নদীবন্দর—সবকিছুই আলাদা অনুভূতি দেয়। চাইলে ডেনমার্ক থেকে সুইডেন বা জার্মানি ট্রেন/ফেরিতেও যেতে পারবেন।
ডেনমার্ক ভ্রমণ ভিসার আবেদন প্রথম দেখায় জটিল মনে হলেও ধাপে ধাপে এগোলে বিষয়টা বেশ সহজেই সামলানো যায়। আসল গুরুত্ব কাগজপত্রের মান, আপনার আর্থিক সক্ষমতা, আর ভ্রমণের উদ্দেশ্যে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা। একটু সময় দিলে এবং গুছিয়ে কাজ করলে ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ভালো।



