টেকসই ভ্রমণের বিশ্বদূত হিসেবে এগিয়ে এলেন টিকটকের তারকা খাবি লেম

ছবি : সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : টিকটকে নীরব অভিব্যক্তি আর অদ্ভুতভাবে সহজ সমাধান দেখানোর মাধ্যমে যিনি রাতারাতি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, সেই খাবি লেম এবার এক ভিন্ন ভূমিকায় বিশ্বমঞ্চে পা রাখলেন। তাকে জাতিসংঘ পর্যটনের নতুন গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য টেকসই ভ্রমণ, দায়িত্বশীল পর্যটন এবং বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে সামনে আনা।

ডিজিটাল যুগে পর্যটনের গল্প বদলে যাচ্ছে। মানুষ এখন আর শুধু গন্তব্য খোঁজে না; তারা খোঁজে অভিজ্ঞতা, মানবিক সম্পর্ক, স্থানীয় সংস্কৃতির স্পর্শ এবং পরিবেশ-বান্ধব ভ্রমণের ধরণ। জাতিসংঘ পর্যটনের মতে, এমন পরিবর্তনের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতারা—যাদের একটি ভিডিও, একটি কথোপকথন বা একটি অভিজ্ঞতার গল্প লক্ষ লক্ষ মানুষের ভ্রমণ-ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে। ঠিক এই বাস্তবতাকেই সামনে রেখে খাবি লেমকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

ডিজিটাল তারকা থেকে বিশ্বদূত—খাবি লেমের নতুন যাত্রা

খাবি লেমের জনপ্রিয়তার কারণ খুবই সাধারণ—তিনি জটিল বিষয়গুলিকে অবিশ্বাস্যভাবে সহজভাবে দেখান, আর তার হাস্যরস ভেঙে দেয় ভাষা এবং ভৌগোলিক সীমান্ত। বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে তার ভিডিও শুধু বিনোদন নয়, বরং এক ধরনের আশাবাদী বার্তা। আর সেই প্রভাবই তাকে তুলে এনেছে আন্তর্জাতিক পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায়।

জাতিসংঘের পর্যটন বলছে, খাবির মতো একজন স্রষ্টা তরুণ প্রজন্মের কাছে এমন বার্তা পৌঁছে দিতে সক্ষম, যা অনেক প্রচার এবং প্রচারণা দিয়েও সম্ভব হয় না। তাই তাকে শুধু একটি প্রতীক নয়, বরং পরিবর্তনের এক সক্রিয় মুখ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

খাবি লেম মনোনয়নের পর এক বিবৃতিতে জানান, এই দায়িত্ব তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। তার ভাষায়, “মানুষকে হাসানো দিয়ে আমার যাত্রা শুরু হলেও, আজ আমি চাই মানুষকে ভ্রমণের মাধ্যমে পৃথিবীকে রক্ষা করার কথা মনে করিয়ে দিতে। আমাদের প্রত্যেকেরই ছোট ছোট কাজ পৃথিবীকে আরও ভালো করতে পারে।”

কী করবেন নতুন দূত?

গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে খাবি লেমের ভূমিকা হবে তিনটি বড় বিষয়ে জোর দেওয়া—

১. দায়িত্বশীল ভ্রমণের প্রচার

পর্যটন বাড়ছে, কিন্তু তার সঙ্গে পরিবেশগত চাপও বাড়ছে। কোন অঞ্চল ভ্রমণে কী সতর্কতা দরকার, কীভাবে স্থানীয়দের সংস্কৃতি এবং পরিবেশ রক্ষা করা যায়—এসব বার্তা খাবির কনটেন্টের মাধ্যমে পৌঁছে দেবে বিশ্বজুড়ে তরুণ দর্শকদের কাছে।

২. সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরা

বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলেই রয়েছে নিজস্ব খাবার, কারুশিল্প, উৎসব, স্থাপত্য ও জীবনধারা। অনেক সময় এগুলো পর্যটনের আলোচনায় হারিয়ে যায়। খাবির কনটেন্ট সেই ‘অদেখা সৌন্দর্য’কে সামনে আনবে, যা পর্যটনকে আরও মানবিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করবে।

৩. টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা সমর্থন করা

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে পর্যটনের সংযোগ আরও দৃঢ় করতে কাজ করবেন তিনি। বিশেষ করে গ্রামীণ পর্যটন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, নারী-পুরুষের সমান সুযোগ এবং দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক অনুশীলনের প্রচারে তার অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

জাতিসংঘ পর্যটনের চোখে খাবি লেম

জাতিসংঘ পর্যটনের মহাসচিব জুরাব পোলোলিকাশভিলি বলেছেন, “খাবি লেম এমন একজন মানুষ যিনি ভাষা ছাড়াই প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেন। তিনি দেখিয়েছেন যে মানবিক যোগাযোগের শক্তি সীমাহীন। পর্যটন ঠিক এই শক্তির ওপর ভর করেই বিশ্বকে যুক্ত করে। তাই তাকে আমাদের দূত করা সময়ের দাবি।”

জাতিসংঘ পর্যটনের মতে, নতুন প্রজন্ম আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ভ্রমণ করছে, নতুন জায়গা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী, এবং ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে তাদের ভ্রমণ-ভাবনা তৈরি হয়। সেই প্রেক্ষাপটে খাবি লেমকে দূত হিসেবে নিয়োগ শুধু আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নয়; বরং ভবিষ্যতের পর্যটননীতির সঙ্গে ডিজিটাল সংস্কৃতির এক শক্তিশালী মিলন।

পর্যটনে প্রভাবশালীদের বাড়তি গুরুত্ব

গত কয়েক বছরে দেখা গেছে, ভ্রমণে প্রভাবশালীদের একটি কথাই কোটি মানুষের আচরণ বদলে দিতে পারে। কোন শহরে যাওয়া উচিত, কোন খাবারটি অবশ্যই চেখে দেখা উচিত, কোথায় ছবি তুলতে হবে কিংবা কোথায় যেতে হবে না—এসব সিদ্ধান্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ধারক ভূমিকা পালন করছে।

জাতিসংঘ পর্যটনের ধারণা, এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাবে। আর তাই তারা চায় প্রভাবশালীরা শুধু সুন্দর দৃশ্য নয়—দায়িত্ববোধও ছড়িয়ে দিক।

রিয়াদে ঘোষণার মধ্য দিয়ে নতুন অধ্যায়

সৌদি আরবের রিয়াদে জাতিসংঘ পর্যটনের সাধারণ অধিবেশনে খাবি লেমের নাম ঘোষণার মাধ্যমে এই নতুন অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের প্রথম যৌথ প্রকল্প উন্মোচিত হবে, যেখানে তুলে ধরা হবে নতুন প্রজন্মের ভ্রমণ অভ্যাস, লুকানো গন্তব্য এবং পৃথিবীকে ভালো রাখার ছোট উদ্যোগ।

একজন টিকটক তারকা থেকে বিশ্ব পর্যটনের দূত—খাবি লেমের এই পরিবর্তন শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং ডিজিটাল যুগে বৈশ্বিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার নতুন এক সম্ভাবনার প্রতীক। তিনি কীভাবে তার প্রভাবকে ব্যবহার করে পর্যটনের ভবিষ্যৎকে আরও দায়িত্বশীল পথে নিয়ে যান, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Read Previous

মালয়েশিয়া বাংলাদেশি রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলতে এগিয়ে যাচ্ছে

Read Next

সুন্দরবন রক্ষায় নতুন প্রকল্পের যাত্রা: বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ইউরোপীয় তহবিলের বড় সহায়তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular