
ছবি: সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশি রোগীদের বড় একটি অংশ প্রতিবছর বিদেশে চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়ে। এই প্রবণতাকে লক্ষ্য করেই মালয়েশিয়া এখন নিজেদের স্বাস্থ্যসেবা খাতকে এমনভাবে গড়ে তুলছে, যাতে দেশটি বাংলাদেশি চিকিৎসা পর্যটকদের জন্য অন্যতম নির্ভরযোগ্য গন্তব্যে পরিণত হয়। চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত একটি ব্যবসায়িক সভায় মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার মোহাম্মদ শুহাদা বিন ওসমান স্পষ্ট করে বললেন—তারা এই বাজারকে গুরুত্ব দিয়ে সামনে এগোতে প্রস্তুত।
কেন মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে এত গুরুত্ব দিচ্ছে
চিকিৎসা পর্যটনের পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কও দ্রুত বাড়ছে। মালয়েশিয়ার হিসাবে, বর্তমান বাণিজ্য কাঠামো খুবই একতরফা। দেশটি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করেছে তার পরিমাণ ২০৬ মিলিয়ন ডলারের বেশি, যেখানে আমদানি মাত্র ৩৮ মিলিয়ন ডলার। বার্ষিক বাণিজ্যও তিন বিলিয়ন ডলার ছুঁই ছুঁই, কিন্তু ভারসাম্য বাংলাদেশি পণ্যের পক্ষে নয়।
হাইকমিশনার মনে করেন, এই ফাঁকটা কমানো সম্ভব শুধুই বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে। বাংলাদেশের হালকা প্রকৌশল, জাহাজ নির্মাণ আর ইলেকট্রনিক্স—এই কয়েকটি খাতকে তিনি বিশেষভাবে তুলে ধরেন। বিশেষ করে মিরসরাইয়ের অর্থনৈতিক অঞ্চলে মালয়েশিয়ান বিনিয়োগ হলে দু’দেশের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন অনেকটাই কমে আসবে।
যোগাযোগ সহজ না হলে চিকিৎসা পর্যটন এগোবে কীভাবে?
হাইকমিশনারের বক্তব্যে একটা বিষয় অন্য সবকিছুর মতোই গুরুত্ব পেল—সরাসরি ফ্লাইট। তাঁর মতে, ঢাকা–চট্টগ্রাম–কুয়ালালামপুর রুটে নিয়মিত ফ্লাইট চালু হলে শুধু বাণিজ্য নয়, চিকিৎসার জন্য ভ্রমণকারীর সংখ্যা চোখে পড়ার মতো বাড়বে। এখন যারা মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা নিতে যান, তাদের বেশিরভাগই ভিসা জটিলতা, বেশি খরচ আর যাতায়াতের ঝামেলায় নাজেহাল হন। এসব ধাপ সহজ করা গেলে আস্থা বাড়বে।
মালয়েশিয়ার পরিকল্পনার ভিত কোথায়
গত আগস্টে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস মালয়েশিয়া সফর করেন। সেই সফরে দুই দেশ মোট পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই করে—হালাল পণ্য রপ্তানি, টেলিযোগাযোগ সহযোগিতা এবং জ্বালানি খাতে অংশীদারিত্ব ছিল এর মধ্যে। মালয়েশিয়া এদের ভিত্তি ধরেই চিকিৎসা পর্যটনকে তাদের পরবর্তী বড় উদ্যোগ হিসেবে দেখছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৯,০০০ শিক্ষার্থী মালয়েশিয়া-শিক্ষিত। আর মালয়েশিয়ার প্রবাসী কর্মী বাহিনীর ৩৭ শতাংশই বাংলাদেশি। অর্থাৎ মানুষে-মানুষে সম্পর্ক, শিক্ষা, কর্মসংস্থান—সবই মিলে দুই দেশের যোগসূত্র আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্ত। এই সম্পর্ককে আরও বাস্তবমুখী করতে স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসা পর্যটনের হিসাবটা পরিষ্কার
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বিদেশে যান চিকিৎসার জন্য। এদের বেশিরভাগই ভারত, সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ডের দিকে ঝোঁকেন। মালয়েশিয়ার লক্ষ্য এই বাজারের একটি বড় অংশ নিজেদের দিকে টেনে আনা।
কেন?
কারণ তাদের বেসরকারি হাসপাতালগুলো কার্ডিয়াক, অনকোলজি, নিউরো—এসব স্পেশালাইজড চিকিৎসায় বেশ নাম করেছে। খরচও তুলনামূলক কম। মালয়েশিয়া এখন ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা, চিকিৎসা প্যাকেজ বানানো, রোগীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা দেওয়া—এসব কাজ সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিচ্ছে।
আঞ্চলিক সহযোগিতার বড় স্বপ্ন
এই আলোচনার মাঝেই বাংলাদেশ আসিয়ানের পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ পেতে মালয়েশিয়ার সমর্থন চেয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশ রাবার শিল্পকে যৌথভাবে উন্নয়ন করা, পাম তেল বাণিজ্যের নতুন চুক্তি করা—এসব বিষয়েও আগ্রহ দেখিয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের প্রশাসক মোহাম্মদ নূরুল্লাহ নূরী মনে করিয়ে দেন—দুই দেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মিল অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে আরও সহজ করে তোলে। তাঁর ভাষায়, এই শেয়ার্ড হেরিটেজ ভবিষ্যতে নতুন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উদ্যোগকে আরও মজবুত করবে।
যারা আলোচনা এগিয়ে নিলেন
চট্টগ্রামের ব্যবসায়িক শীর্ষ ব্যক্তিরা সভায় সরাসরি মতামত দেন—
থাইল্যান্ডের অনারারি কনসাল আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী, প্রাক্তন সিনিয়র সহ-সভাপতি এম এ সালাম, অনারারি কনসাল মোহাম্মদ আখতার পারভেজ, পার্ক শিপিংয়ের এমডি হুমায়ুন কবির পাটোয়ারী, জহিরুল ইসলাম চৌধুরী আলমগীরসহ আরও অনেকে। সবার বক্তব্যেই একই স্বর—বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক এখন আরও সহযোগিতামুখী এক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সব মিলিয়ে চিত্রটা পরিষ্কার
মালয়েশিয়া শুধু রোগী আনতে চাইছে না। তারা চাইছে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক, বিনিয়োগ, বাণিজ্য আর আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন জোট। বাংলাদেশ—বিশেষ করে চট্টগ্রাম—এই উদ্যোগের কেন্দ্র হতে পারে। দু’দেশই তা বুঝে এখন পরিকল্পনা সাজাচ্ছে।



