১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাপানি কনসোর্টিয়ামের হাতে শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল: দীর্ঘ জটিলতার অবসান ঘটিয়ে চালু হচ্ছে আধুনিক সুবিধা

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তৃতীয় টার্মিনাল, ছবি: সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : অবশেষে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দীর্ঘদিন অব্যবহৃত তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব জাপানি কনসোর্টিয়ামের হাতে তুলে দেওয়ার পথে চূড়ান্ত অগ্রগতি হয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা আজ শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দেশের স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে জাপানি পক্ষকে এই দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের মধ্যেই ওপেন টেন্ডার ছাড়াই আলোচনার ভিত্তিতে এই চুক্তি সম্পন্ন করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মন্ত্রী বলেন, “জাপানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা আরও অব্যাহত থাকবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, যাত্রীদের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করে স্বল্প সময়ের মধ্যে টার্মিনাল চালু করাই সরকারের লক্ষ্য। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতেএকটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে, কারণ জাপানের আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষতা এই টার্মিনালকে বিশ্বমানের করে তুলবে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পটি জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)-এর অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে। প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পের নির্মাণকাজ ৯৯ শতাংশেরও বেশি সম্পন্ন হলেও গত তিন বছর ধরে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি নিয়ে জটিলতায় আটকে ছিল। রাজস্ব বণ্টন, যাত্রী প্রতি এমবার্কেশন ফি, সার্ভিস চার্জ এবং অপারেশনাল কন্ট্রোল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল। গত বছরের আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ায় টার্মিনালটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল, যা দেশের বিমান চলাচল খাতের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

সাম্প্রতিক উন্নয়নে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আলোচনা পুনরায় শুরু হয়। মার্চ মাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ সরকার জাপানি কনসোর্টিয়ামকে সংশোধিত ও কম খরচের প্রস্তাবজমা দেওয়ার অনুরোধ জানায়। জাপানি পক্ষ তাদের প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করে সার্ভিস চার্জ, রাজস্ব ভাগাভাগি এবং অন্যান্য আর্থিক বিষয়ে ঢাকার উদ্বেগ দূর করে নতুন করে অফার দেয়। এতে দুই পক্ষের মধ্যে ফারাক অনেকাংশে কমে আসে।

জাপানি কনসোর্টিয়ামে রয়েছে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো কর্পোরেশন, সোজিৎস কর্পোরেশন এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট কর্পোরেশনের মতো অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান। এই কনসোর্টিয়ামকে ১৫ বছরের জন্য পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জাপানের উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা এই টার্মিনালকে যাত্রীদের জন্য অত্যন্ত আরামদায়ক ও নিরাপদ করে তুলবে।

তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে শাহজালাল বিমানবন্দরের যাত্রী ধারণক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনাল মিলিয়ে যে সক্ষমতা রয়েছে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে এটি বছরে কয়েক মিলিয়ন অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করতে সক্ষম হবে। এছাড়া কার্গো হ্যান্ডলিং, আধুনিক চেক-ইন সুবিধা, ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া এবং লাগেজ ম্যানেজমেন্টে বিপ্লব ঘটবে। ফলে বাংলাদেশের পর্যটন খাত, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ অনেক বেশি গতিশীল হবে। বিশেষ করে হজ যাত্রী, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এটি বড় স্বস্তির খবর।

পর্যটন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই সিদ্ধান্ত দেশের এভিয়েশন সেক্টরের উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাপানি প্রযুক্তি ও জ্ঞানের সমন্বয়ে টার্মিনালটি পরিচালিত হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মানচিত্রে আরও উজ্জ্বল অবস্থানে আসবে। তবে সরকারদেশীয় স্বার্থ, বিশেষ করে রাজস্ব আয় এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সতর্কতার সঙ্গে চুক্তির শর্তাবলী পর্যালোচনা করছে।

আজকের আলোচনায় উভয় পক্ষই ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। জাপানি পক্ষ বাংলাদেশের উদ্বেগের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে সংশোধিত প্রস্তাব দিয়েছে, যা দ্রুত চুক্তি সম্পাদনের পথ প্রশস্ত করেছে। মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা আশা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হবে। কিছু সূত্র অনুসারে, ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে অপারেশন শুরু হতে পারে।

এই উন্নয়ন বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করবে। জাপান বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী, এবং এই প্রকল্প তারই প্রমাণ। বিমানবন্দরের আধুনিকায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে, বিনিয়োগ আকর্ষণ বাড়বে এবং পর্যটকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।

সার্বিকভাবে, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হওয়া শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং বাংলাদেশের আকাশপথে নতুন যুগের সূচনা। সরকারের এই সিদ্ধান্ত যাত্রী, ব্যবসায়ী এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। আলোচনার পরবর্তী ধাপগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হলে খুব শিগগিরই ঢাকার আকাশে নতুন টার্মিনালের উদ্বোধন দেখা যাবে।

Read Previous

বিমানের পাইলট লাইসেন্স কেলেঙ্কারি: সভাপতিসহ চার জনের জাল উড্ডয়ন ঘণ্টা ফাঁস, যাত্রী নিরাপত্তায় উদ্বেগ

Read Next

বিমান ভাড়ায় আগুন: মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ধাক্কায় যাত্রীরা দিশেহারা, এভিয়েশন খাতে সংকট গভীর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular