
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলায় কাঞ্চননগর নামে একটি গ্রাম আছে, যেটি আজ সবার কাছে পরিচিত “পেয়ারা গ্রাম” নামে। পাহাড়-টিলা, সবুজ বাগান আর খাল-নদীর কোলে গড়ে ওঠা এই গ্রাম শুধু কৃষির জন্য নয়, বরং তার সৌন্দর্য আর ঐতিহ্যের জন্যও পর্যটকদের আকর্ষণ করছে প্রতিদিন।
পাহাড়ে গড়া বাগান, ছবির মতো পরিবেশ
গ্রামের ঢালে ঢালে শত শত পেয়ারা গাছ। ভোরের আলোয় বা বর্ষার দিনে সেই দৃশ্য যেন একেবারে ছবির মতো। শঙ্খ নদী আর শ্রীমতী খালের আশপাশের সবুজ প্রকৃতি মিলে এখানে প্রকৃতি আর কৃষি হাত ধরাধরি করে বেঁচে আছে। পর্যটকদের জন্য এটি নিছক ভ্রমণ নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে এক মিষ্টি সম্পর্কের অভিজ্ঞতা।
স্বাদে আলাদা, পুষ্টিতে ভরপুর
কাঞ্চননগরের পেয়ারা দেশের অন্য জায়গার থেকে একটু ভিন্ন। আকারে মাঝারি, কম বিচি, স্বাদে মিষ্টি। ভেতরের অংশ কখনো সাদা, কখনো হলুদাভ, আবার কখনো হালকা লালচে। প্রতি ১০০ গ্রামে প্রচুর পানি, আঁশ, ভিটামিন সি আর কম ক্যালরি থাকায় এটি সুস্বাদু তো বটেই, স্বাস্থ্যকরও। এ কারণেই স্থানীয়রা বলে—“মুখে মিষ্টি, মনেও মিষ্টি।”
গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ
চন্দনাইশে প্রায় ৭৫০ হেক্টরে পেয়ারা চাষ হয়, এর মধ্যে ৭৩০ হেক্টর জমিই কাঞ্চননগরে। এখানকার অর্ধলক্ষ মানুষ সরাসরি এই চাষের সঙ্গে যুক্ত। মৌসুমে কোটি কোটি টাকার পেয়ারা বিক্রি হয়। বাজারজাত হয় চট্টগ্রাম শহর, দোহাজারী, রওশন হাট, বাদামতল ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। শুধু দেশেই নয়, এখানকার পেয়ারা ইতোমধ্যে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতেও রপ্তানি হচ্ছে।
ঐতিহ্যের গল্প
ষাটের দশক থেকেই এ এলাকায় পেয়ারা চাষ শুরু। সেই সময়ের বড় চাষিদের একজন ছিলেন আইয়ুব আলী খান। তাঁর পরিবার দশ একর থেকে শুরু করে আজ কয়েক দশ একরে পেয়ারা বাগান গড়ে তুলেছেন। এরপর থেকে ধীরে ধীরে পুরো গ্রামেই পেয়ারা চাষ ছড়িয়ে পড়ে। এখন এটি কেবল ফল নয়, একটি সংস্কৃতি। লোকগানেও এর উল্লেখ আছে—“গয়াম ভাল পটিয়ার…”—যা এই ফলের প্রতি মানুষের ভালোবাসার প্রমাণ।
পর্যটকদের আমন্ত্রণ
বর্ষা আর শরৎকাল—এ সময়েই কাঞ্চননগরের রূপ সবচেয়ে আকর্ষণীয়। গ্রামের প্রতিটি কোণে ঝুলে থাকা পেয়ারা দেখতে দেখতে হেঁটে বেড়ানো বা স্থানীয় বাজার থেকে টাটকা পেয়ারা খাওয়ার আনন্দ তুলনাহীন। তবে ভ্রমণে গেলে স্থানীয় পরিবেশ, কৃষকদের শ্রম আর বাগানের সৌন্দর্য যেন সম্মান বজায় রেখে উপভোগ করা হয়—এই আহ্বানও জানাচ্ছেন গ্রামবাসী।
কাঞ্চননগরের পেয়ারা গ্রাম শুধু কৃষির গল্প নয়, এটি একটি ঐতিহ্যের গল্প, স্বাদের গল্প, অর্থনীতির গল্প। আর পর্যটকের কাছে এটি প্রকৃতির সঙ্গে মিষ্টি এক অভিজ্ঞতার জায়গা। একবার যাওয়া মানে শুধু পেয়ারা খাওয়া নয়, পুরো একটা গ্রামের প্রাণচাঞ্চল্য, ইতিহাস আর ভালোবাসা ছুঁয়ে দেখা।



