
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: জেরুজালেমের পুরনো শহরের হৃদয়ে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদ—যা মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র স্থান—এখন এক অস্থির সময় পার করছে। কয়েক দশক ধরে মুসলিমদের একক প্রার্থনার জায়গা হলেও গত কয়েক বছরে সেখানে ইহুদিদের প্রবেশ, প্রার্থনা এবং পতাকা ওড়ানো স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলার পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে।
ইসলামিক ওয়াকফের আন্তর্জাতিক বিষয়ক পরিচালক আউনি বাজবাজ জানান, ইহুদিদের দলবদ্ধ প্রার্থনা, নাচ এবং পতাকা ওড়ানো সরাসরি আল-আকসার ওপর ইসরায়েলি সার্বভৌমত্ব চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল। তার মতে, আন্তর্জাতিক আইন ও পুরনো চুক্তি ভঙ্গ করে ইসরায়েল আল-আকসাকে ধীরে ধীরে ভাগাভাগির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
ঐতিহাসিক পটভূমি
অটোমান আমলে করা স্ট্যাটাস কো চুক্তি অনুযায়ী, পুরো আল-আকসা কমপ্লেক্স মুসলিম প্রশাসনের অধীনে থাকার কথা। ওয়াকফ কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে মুসলিমরা নামাজ আদায় করবে এবং অমুসলিমরা নির্দিষ্ট সময় ও শর্তে প্রবেশ করতে পারবে। কিন্তু ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর থেকেই ইসরায়েল মুসলিমদের প্রবেশে বিধিনিষেধ বাড়াতে শুরু করে।
২০০২ সালে এরিয়েল শ্যারনের সামরিক অনুপ্রবেশের পর দ্বিতীয় ইন্তিফাদার জন্ম হয়, আর সেই সময় থেকে ইসরায়েলি সেনা ও পুলিশ আল-আকসায় স্থায়ী উপস্থিতি তৈরি করে। একই সময়ে টেম্পল মাউন্ট অ্যাক্টিভিস্টদের মতো সংগঠনগুলো প্রকাশ্যে মসজিদের ভেতরে ইহুদি মন্দির নির্মাণের দাবি তোলে।
বর্তমান পরিস্থিতি
ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী এখন প্রায় নিয়মিতভাবে মসজিদের প্রবেশপথে মোতায়েন থাকে। ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, ৫০ বছরের কম বয়সী মুসলিম পুরুষদের প্রবেশ প্রায়ই বন্ধ রাখা হয়, অথচ ইহুদিদের দলবদ্ধ অনুপ্রবেশ সহজভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে শুধু এক বছরেই ৫৬ হাজারের বেশি ইহুদি আল-আকসায় প্রবেশ করেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রকাশ্যে ইহুদিদের প্রার্থনা বেড়েছে। ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গিভির নিজেও আল-আকসায় গিয়ে প্রার্থনা করেছেন এবং প্রকাশ্যে এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা
২০২৩ সালে ইসরায়েলি এমপি অমিত হালেভি আল-আকসাকে মুসলিম ও ইহুদিদের মধ্যে ভাগ করার প্রস্তাব দেন। দক্ষিণাংশ মুসলিমদের জন্য রেখে উত্তরাংশ, যার মধ্যে ডোম অব দ্য রক রয়েছে, ইহুদিদের জন্য বরাদ্দ করার পরিকল্পনা তোলা হয়। যদিও এটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি, তবে পর্যবেক্ষকরা বলছেন ইসরায়েল ধাপে ধাপে সেই দিকেই এগোচ্ছে।
ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজায়েল স্মোরিচ সম্প্রতি ঘোষণা দেন যে, তারা আল-আকসায় তৃতীয় মন্দির নির্মাণের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করবেন। ফিলিস্তিনিরা আশঙ্কা করছে, ইব্রাহিমি মসজিদের মতো এখানেও প্রথমে একটি সিনাগগ তৈরি করা হবে, তারপর ধাপে ধাপে পুরো মসজিদ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হবে।
মুসলিম বিশ্বের জন্য বার্তা
ইসলামিক ওয়াকফের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, আল-আকসায় যা ঘটছে তা কোনো সাময়িক লঙ্ঘন নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত ইহুদিকরণ প্রকল্প। একবার ইসরায়েলি সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
বর্তমানে আল-আকসা শুধু ধর্মীয় ইবাদতের স্থান নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা, আত্মপরিচয় ও সংগ্রামের প্রতীক। তাই মুসলিম বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এটি এক বড় পরীক্ষা—তারা কীভাবে এই পরিবর্তনের জবাব দেয়, সেটিই ঠিক করবে ভবিষ্যতে আল-আকসার পরিণতি।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই



