
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: ‘ধান, নদী, খাল—এই তিনে বরিশাল’—এই প্রবাদবাক্য যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে বরিশাল থেকে ভোলা যাওয়ার নৌপথে। নদীপ্রেমী কিংবা ভ্রমণপিপাসু যে কারও জন্য এই রুটটি হতে পারে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
রোববার দুপুরে বরিশাল নদীবন্দরে এমভি বিউটি অব ইমা এক্সপ্রেস লঞ্চে উঠলে শুরু হয় এক রোমাঞ্চকর যাত্রা। কীর্তনখোলা নদীর নীল জলের বুকে ভেসে চলে লঞ্চ। ১৮০১ সালের পূর্বে এই নদীকে ডাকা হতো বরিশাল বা সুগন্ধা নামে। এখন এটি বরিশাল থেকে ঝালকাঠি পর্যন্ত বিস্তৃত।

প্রায় আড়াই কিলোমিটার যাওয়ার পর লঞ্চ ঢুকে পড়ে বুখাইনগর নদীতে। দুই পাশে সাজানো প্রকৃতি—চরমোনাই ও কাউয়ার চর। হোগলাবন, রেইনট্রি, শিরীষ, কলা ও আমড়াবাগানের সবুজে চোখ জুড়িয়ে যায়। নদীতীরে দেখা মেলে খেজুরগাছে রঙিন খেজুর, ভাঙনমুখী বসতবাড়ি আর মানুষের জীবনের সাথে মিশে থাকা নদীর নিবিড় সম্পর্ক।
১২ কিলোমিটার দীর্ঘ বুখাইনগর নদীপথ অতিক্রম করে লঞ্চ পৌঁছে লাহারহাটে, যেখানে মিলেছে বিঘাই, কালাবদর, তেঁতুলিয়া ও গণেশপুরা নদী। এখানে নদীই যেন ইতিহাসের দালিলিক সাক্ষী। বিঘাই নদী দক্ষিণে পটুয়াখালীর গুলিশাখালী হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। জলপথের পাশে শত শত মাছধরা নৌকা, মহিষের পাল আর জলচর পাখি মিলে তৈরি করেছে এক অপার দৃশ্যপট।
এরপর লঞ্চ এগিয়ে চলে শ্রীপুর, ভেদুরিয়া ও শেষমেশ ভোলা খেয়াঘাটের দিকে। শ্রীপুর থেকে ভেদুরিয়া পর্যন্ত চলে তেঁতুলিয়া নদীর উপর দিয়ে। এই নদী মেঘনার একটি ধারা, যা বরিশাল, ভোলা ও পটুয়াখালীর বিস্তীর্ণ অঞ্চল অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এটি ইতিহাসে অনেক রাজা-প্রজার জমিদারির পতনের সাক্ষ্য বহন করে।

বর্তমানে এই নদীতীরবর্তী চরাঞ্চলে গড়ে উঠেছে তরমুজ, ক্যাপসিকাম, ও অন্যান্য সবজির চাষ। কোথাও কোথাও দেখা যায় মহিষের পাল, আবার শীতে আসে পরিযায়ী পাখি। নৌপথে স্পিডবোট, লঞ্চ, ফেরি আর জেলে নৌকার মিলনমেলায় তৈরি হয়েছে এক ব্যস্ত ও জীবন্ত পরিবেশ। জেলেরা বিক্রি করছেন সদ্য ধরা টাটকা মাছ।
বরিশাল থেকে ভোলা—এই নদীপথের প্রতিটি বাঁকে আছে একেকটি নদী, একেকটি গল্প। প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাসে ভরপুর এ পথটি হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম নৌ-ভ্রমণ রুট। পর্যটকদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।
পর্যটনের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
- বর্ষাকালে নদীর রূপ হয় প্রাণবন্ত ও চলাচল সহজ।
- বুখাইনগর ও লাহারহাট হয়ে ভেদুরিয়া পর্যন্ত যাত্রায় একাধিক নদীর মিলনস্থল দেখা যাবে।
- স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা, মাছধরা এবং বিক্রির দৃশ্য পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকে।
- চরাঞ্চলে চাষাবাদ ও পশুপালন দেখা যায়। শীতকালে পরিযায়ী পাখির দর্শন মিলতে পারে।
পর্যটনের উন্নয়নে সম্ভাবনা:
নৌপথ ঘিরে ভাসমান ক্যাফে, নদীভিত্তিক ইকো-ট্যুরিজম, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রদর্শনী এবং মাছভিত্তিক ফুড ট্যুরিজম গড়ে উঠতে পারে এই অঞ্চলে।এই নদীময় পথ একদিকে যেমন ইতিহাসের ধারক, তেমনি পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। বরিশাল থেকে ভোলার এই জলপথ হতে পারে বাংলাদেশ পর্যটনের এক নতুন দিগন্ত।
-পর্যটন সংবাদ। নিজস্ব প্রতিবেদক



