১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

থাইল্যান্ডের রিসোর্টে ২২ বাংলাদেশি আটক

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক :থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় চানা জেলায় একটি সমুদ্রতীরবর্তী রিসোর্ট থেকে ২১ জন বাংলাদেশি ও একজন মিয়ানমার নাগরিকসহ মোট ২২ জন অবৈধ অভিবাসীকে আটক করেছে দেশটির পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, এই রিসোর্টটি মালয়েশিয়ায় পাচারের অস্থায়ী আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। রিসোর্টের মালিকানায় রয়েছেন ৬৬ বছর বয়সী কৃতিদেত নামে এক অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, যিনি সোংখলা প্রদেশের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা বিভাগে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে অবসর নিয়েছেন। থাইল্যান্ডের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক দ্য ব্যাংকক পোস্ট এই ঘটনার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে।

ঘটনাটি ঘটে বুধবার (৮ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে। সোংখলা ইমিগ্রেশন পুলিশ ও পর্যটন পুলিশের একটি যৌথ দল চানা জেলার না থাব এলাকায় অবস্থিত ওই রিসোর্টে অভিযান চালায়। পুলিশ সূত্র জানায়, রিসোর্টটি বন্ধ থাকলেও ভেতর থেকে অপরিচিত ভিনদেশি ভাষায় কথাবার্তার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সন্দেহবশত পুলিশ একটি পরিত্যক্ত ভবনের সরু প্রবেশপথে ত্রিপল দিয়ে ঢাকা গোপন পথ ধরে ভেতরে প্রবেশ করে। সেখানে দেখা যায়, ২২ জন বিদেশি নাগরিক গাদাগাদি করে বসে আছেন। আটককৃতদের মধ্যে ২১ জন বাংলাদেশি পুরুষ এবং একজন মিয়ানমারের নারী রয়েছেন। তাদের বয়স ২০ থেকে ৪৬ বছরের মধ্যে। অভিযানের সময় রিসোর্ট মালিক কৃতিদেতকেও আটক করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কৃতিদেত অভিযোগ অস্বীকার করলেও পুলিশ তার শয়নকক্ষের খাটের নিচ থেকে দুটি বাক্সে লুকিয়ে রাখা ১৬টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করে। আটক অভিবাসীরা জানিয়েছেন, এসব ফোন তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তারা পুলিশের কাছে ফোনগুলো ফেরত চেয়ে আবেদন জানান। অভিবাসীদের বয়ান অনুসারে, তারা প্রত্যেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য দালালদের কাছে মাথাপিছু ৭ লাখ টাকা দিয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে বিমানযোগে কম্বোডিয়ায় পৌঁছে গত ৪ এপ্রিল সা কায়েও সীমান্ত দিয়ে পায়ে হেঁটে থাইল্যান্ডে প্রবেশ করেন তারা। এরপর কয়েক দফায় তাদের এই রিসোর্টে নিয়ে আসা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এখান থেকে তাদের মালয়েশিয়ায় পাচার করার পরিকল্পনা ছিল।

এই ঘটনা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচার চক্রের একটি নতুন মাত্রা উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়া ও অন্যান্য দেশে অভিবাসী পাচারের রুট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কর্মসংস্থানের অভাবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে হাজার হাজার মানুষ প্রতি বছর এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন। থাইল্যান্ডের সমুদ্রতীরবর্তী এলাকাগুলো প্রায়ই পাচারকারীদের জন্য সুবিধাজনক আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই রিসোর্টটি বন্ধ থাকায় পাচারকারীরা এটিকে নিরাপদ মনে করে ব্যবহার করছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ জানতে পেরেছে যে, তারা দালালদের প্রতিশ্রুতিতে আকৃষ্ট হয়ে দেশ ছাড়েন। মালয়েশিয়ায় পৌঁছালে ভালো চাকরি ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল তাদের। কিন্তু থাইল্যান্ডে প্রবেশের পরই তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং গোপন স্থানে আটকে রাখা হয়। এই ধরনের পাচার চক্রে স্থানীয় প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ নতুন নয়। কৃতিদেতের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তির রিসোর্ট এমন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় থাই সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে এই ঘটনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলছে।

পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে যে, অভিবাসীরা খুয়ান মিদ পুলিশ স্টেশনে আইনি প্রক্রিয়ার অধীনে রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ প্রবেশ ও অবস্থানের অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে, রিসোর্ট মালিক কৃতিদেতের বিরুদ্ধে অবৈধ অভিবাসীদের আশ্রয় ও সহায়তা প্রদানের অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তদন্ত এখনও চলছে। পুলিশ জানিয়েছে, পাচার চক্রের অন্যান্য সদস্যদের চিহ্নিত করতে তারা বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করছে। উদ্ধারকৃত মোবাইল ফোনগুলো থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই ঘটনা বাংলাদেশের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটিতে অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে থাইল্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে আটক বাংলাদেশিদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। মানবপাচার রোধে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। থাইল্যান্ডের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আটক অভিবাসীদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে তদন্ত সমাপ্তির পর।

এদিকে, স্থানীয় পর্যটন শিল্পের ওপরও এই ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। চানা জেলার সমুদ্রতীরবর্তী এলাকাগুলো পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। কিন্তু অবৈধ অভিবাসন ও পাচারের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এই অঞ্চলের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে। থাই সরকার এই ধরনের ঘটনা রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলেছেন, সীমান্ত নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা এমন অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সার্বিকভাবে, এই অভিযান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে একটি সফল অভিযান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি শুধু একটি ঘটনা নয়; বৃহত্তর চক্রের একটি অংশ। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আটক অভিবাসীদের পরিবারগুলো এখন উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। তারা আশা করছেন, দ্রুত তাদের স্বজনদের দেশে ফেরত পাঠানো হবে। অন্যদিকে, কৃতিদেতের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তির জড়িত থাকায় থাইল্যান্ডের প্রশাসনিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, অবৈধ অভিবাসনের পথ শুধু জীবনের ঝুঁকি নয়, বরং আর্থিক শোষণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনেরও কারণ। বাংলাদেশ সরকারসহ আঞ্চলিক দেশগুলোকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। থাইল্যান্ডের পুলিশ তদন্ত অব্যাহত রেখেছে এবং আরও গ্রেপ্তারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই মামলার পরবর্তী অগ্রগতি আন্তর্জাতিক মহলে নজর রাখার বিষয় হয়ে উঠেছে।

Read Previous

পাহাড়ে প্রাণের উৎসব: বৈসাবির রঙে মেতেছে খাগড়াছড়ি, ঐতিহ্যবাহী খেলায় ফিরছে হারানো স্মৃতি

Read Next

এয়ার আরাবিয়া সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৪৯টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে সীমিত ফ্লাইট পুনরায় চালু করল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular