ত্রিদেশীয় যুদ্ধে দুবাইয়ের পর্যটন খাতে বড় ধাক্কা

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : দুবাই, যা একসময় বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ও বিলাসবহুল পর্যটন গন্তব্য হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিল, এখন ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকার ত্রিমুখী যুদ্ধের ধাক্কায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের পাল্টা আক্রমণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) অর্থনৈতিক রাজধানী দুবাই। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টসহ বুর্জ আল আরবের মতো আইকনিক হোটেল ও অন্যান্য পর্যটন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, বুকিং বাতিলের হিড়িক পড়েছে এবং পুরো খাতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে দুবাই। বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিল (ডব্লিউটিটিসি) এবং টুরিজম ইকোনমিক্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন খাতে বছরে ৩৪ থেকে ৫৬ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করতে পারে, যার একটি বড় অংশ দুবাইয়ের উপরই পড়ছে।

যুদ্ধের শুরু থেকেই দুবাইয়ের পর্যটন খাতে ধস নেমেছে। ২০২৫ সালে দুবাই রেকর্ড ১৯.৫৯ মিলিয়ন আন্তর্জাতিক রাত্রিযাপনকারী পর্যটককে স্বাগত জানিয়েছিল, যা আগের বছরের তুলনায় ৫ শতাংশ বেশি। কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহেই ৮০ হাজারেরও বেশি হোটেল বুকিং বাতিল হয়েছে শুধুমাত্র দুবাইয়ে। বিলাসবহুল হোটেলগুলোর অকুপেন্সি রেট ৮৬ শতাংশ থেকে নেমে ২০ শতাংশ বা তারও নিচে চলে গেছে কোনো কোনো এলাকায়। ডাউনটাউন দুবাই ও বুর্জ খলিফার আশেপাশের প্রিমিয়াম হোটেলগুলোতে রুমের দাম ৫০ শতাংশেরও বেশি কমিয়ে ১৫০ থেকে ৩০০ ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে, যেখানে সাধারণত ৪০০ থেকে ৮০০ ডলার ছিল। এয়ারডিএনএ-র তথ্য অনুসারে, ইউএইতে ভ্যাকেশন রেন্টাল বুকিং বাতিলের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ৮৪৫০-এ পৌঁছেছে।

দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ইরানি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং টানা তিন দিন বন্ধ থাকে। এতে লক্ষাধিক যাত্রী আটকে পড়েন। ইউএই সরকার ২০ হাজার ২০০ আটকে পড়া পর্যটকের খাবার ও থাকার খরচ বহন করার ঘোষণা দেয়। এমিরেটস এয়ারলাইন্সসহ অন্যান্য ক্যারিয়ারগুলো ফ্লাইট সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য বলছে, যুদ্ধের আগে যেখানে এমিরেটস দৈনিক ৫২৭টি ফ্লাইট পরিচালনা করত, এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ৩০৯-এ। আবু ধাবির যায়েদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টও একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বিমানবন্দরগুলো মধ্যপ্রাচ্যের ১৪ শতাংশ আন্তর্জাতিক ট্রানজিট ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করত, যা এখন ব্যাহত হয়ে পুরো বিশ্বের ভ্রমণকে প্রভাবিত করছে।

হোটেল সেক্টরেও বিপর্যয় চরমে। বুর্জ আল আরব হোটেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে ইরানি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আগুন লেগেছে। ফেয়ারমন্ট দ্য পাম হোটেলেও প্রজেক্টাইল আঘাত করে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, যার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। চারজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে, যদিও কোনো অতিথি বা কর্মী নন। এই ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক পর্যটকদের মনে নিরাপত্তাহীনতার ভয় জাগিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো ইউএইতে সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। অনেক এয়ারলাইন্স বিনামূল্যে বুকিং পুনঃনির্ধারণের সুযোগ দিচ্ছে, কিন্তু নতুন বুকিং প্রায় শূন্য।

টুরিজম ইকোনমিক্সের দুটি সিনারিও অনুসারে ক্ষতির পরিমাণ আরও স্পষ্ট হয়। যদি যুদ্ধ ১-৩ সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয় (আর্লি রেজোলিউশন), তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে আন্তর্জাতিক পর্যটক ১১ শতাংশ কমে ২৩ মিলিয়ন কম পর্যটক আসবে এবং ৩৪ বিলিয়ন ডলারের স্পেন্ডিং লস হবে। যদি যুদ্ধ এক-দুই মাস চলে (প্রোট্র্যাক্টেড), তাহলে ২৭ শতাংশ কমে ৩৮ মিলিয়ন পর্যটক কমবে এবং ক্ষতি ৫৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। জিসিসি দেশগুলো, বিশেষ করে ইউএই ও দুবাই, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কারণ এরা নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার উপর নির্ভরশীল। দুবাইয়ের পর্যটন খাত আগে বছরে ১৯৪ বিলিয়ন ডলারের পর্যটক স্পেন্ডিংয়ের একটি বড় অংশ পেত। এখন প্রতিদিন মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন খাত ৬০০ মিলিয়ন ডলারের স্পেন্ডিং হারাচ্ছে বলে ডব্লিউটিটিসি জানিয়েছে। প্রথম ২০ দিনেই অঞ্চলীয় পর্যটন রেভিনিউ লস ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

এই ক্ষতি শুধু সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। দুবাইয়ের অর্থনীতি পর্যটন, বাণিজ্য ও আতিথেয়তার উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। হোটেলগুলো এখন ডোমেস্টিক টুরিস্ট ও অ্যানসিলারি রেভিনিউয়ের দিকে ঝুঁকছে। রেস্তোরাঁগুলো মেনু ছোট করে, স্যালারি কমিয়ে খরচ সাশ্রয় করছে। বড় ইভেন্ট যেমন আইএএপিএ এক্সপো মিডল ইস্ট ২০২৭ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। রায়ানএয়ারের সিইও মাইকেল ও’লিয়ারি বলেছেন, “মধ্যপ্রাচ্যের বুকিংয়ে বড় ধস নেমেছে। এটি গাল্ফের এয়ার ট্রাভেলে আস্থা নষ্ট করেছে।” টিইউআই জার্মানির প্রধান বেঞ্জামিন জ্যাকোবি জানিয়েছেন, “চাহিদায় নিশ্চয়ই ডিপ হবে, কিন্তু এটি যুদ্ধের গতিপথের উপর নির্ভর করছে। সবকিছু খুবই অস্থির।”

দুবাই টুরিজম অফিস জানিয়েছে, পর্যটকদের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তারা হোটেলগুলোকে আটকে পড়া অতিথিদের সাহায্য করার নির্দেশ দিয়েছে। সরকার ১ বিলিয়ন দিরহাম (প্রায় ২৭২ মিলিয়ন ডলার) তহবিলঘোষণা করেছে, যাতে হোটেলগুলোর সরকারি ফি তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে এবং টুরিজম দিরহাম ফি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব স্বল্পমেয়াদি সাহায্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি পূরণ করতে পারবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটনকে বছরের পর বছরের বিনিয়োগের ফসল নষ্ট করে দিচ্ছে। আবু ধাবি থেকে দুবাই পর্যন্ত বিলিয়ন ডলার খরচ করে নিরাপদ, উচ্চমানের গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। এখন সেই ইমেজ ধুলিসাৎ হচ্ছে। ইউরোপের দিকে পর্যটকদের প্রবাহ বাড়ছে, যেখানে নিরাপত্তা নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই। ডব্লিউটিটিসি বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন বুম শেষ হয়ে যেতে পারে যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়।

বর্তমানে (এপ্রিল ২, ২০২৬) যুদ্ধ এখনও চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতির উদ্দেশে ভাষণে বলেছেন, “আমাদের লক্ষ্য প্রায় সম্পূর্ণ, আরও দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে।” কিন্তু ইরান পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। দুবাইয়ের পর্যটন খাত এখন অপেক্ষায়—কখন যুদ্ধ থামবে এবং আস্থা ফিরবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি যুদ্ধ শিগগির শেষ হয় তবুও সেন্টিমেন্টের প্রভাব থেকে যাবে বছরের পর বছর। দুবাইয়ের অর্থনীতির মেরুদণ্ড পর্যটন খাতকে পুনরুদ্ধার করতে বিপুল প্রচেষ্টা লাগবে।

এই সংঘাত শুধু দুবাই নয়, পুরো গাল্ফ অঞ্চলের পর্যটনকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। একদিকে যেমন অবকাঠামোগত ক্ষতি, অন্যদিকে মানসিক আঘাত। পর্যটকরা এখন ইউরোপ বা অন্য নিরাপদ গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন। দুবাইয়ের হোটেল ম্যানেজাররা বলছেন, “আমরা আগে কোভিড মোকাবিলা করেছি, এবারও করব। কিন্তু এবারের ধাক্কা অনেক বেশি গভীর।” সরকারি উদ্যোগ, মার্কেটিং ক্যাম্পেইন এবং নিরাপত্তা প্রটোকল জোরদার করে হয়তো আস্থা ফেরানো যাবে, কিন্তু বর্তমানে দুবাইয়ের পর্যটন খাত এক অন্ধকার টানেলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

এই যুদ্ধের ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি দুবাইয়ের গ্লোবাল ইমেজকেও চ্যালেঞ্জ করছে। বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা ‘সেফ হ্যাভেন’ ইমেজ এখন প্রশ্নের মুখে। যদি যুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়, তাহলেও পুনরুদ্ধারে সময় লাগবে। আর যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে ক্ষতি অপূরণীয় হয়ে যাবে। দুবাইয়ের পর্যটন খাত এখন শুধু অপেক্ষা করছে—শান্তির জন্য, পর্যটকদের ফিরে আসার জন্য। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, এই ত্রিমুখী যুদ্ধের ছায়া এখনও অনেক দীর্ঘ।

Read Previous

ক্যারাভানিং: বিশ্রামের পরিবর্তে ‘বেঁচে থাকার’ যাত্রায় ভিয়েতনামী পর্যটকদের নতুন আকর্ষণ

Read Next

নভোএয়ার ঘোষণা করলো সব রুটে ১৫% ছাড় ও কক্সবাজারে বিশেষ ভ্রমণ প্যাকেজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular