বান্দরবানে পর্যটকের ঢলে জ্বালানি সংকট তীব্র: ছুটির আনন্দে ছায়া, ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : পবিত্র ঈদুল ফিতর ও স্বাধীনতা দিবসের টানা ছুটিকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি জেলা বান্দরবানে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম ঘটেছে। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে হাজারো পর্যটক মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও দূরপাল্লার বাসে করে জেলায় ঢুকছেন। কিন্তু এই আনন্দময় ভ্রমণ যেন হঠাৎ করে পরিণত হয়েছে ভোগান্তিতে। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে সড়কে নেমেছে অচলাবস্থা। বিশেষ করে অকটেনের অভাবে ছোট যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পর্যটকের চাপ কমলে দু-এক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তবে বর্তমানে এই সংকটে পর্যটকদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ঈদের ছুটি ১৭ মার্চ থেকে শুরু হলেও পর্যটকদের চাপ বাড়তে থাকে ২০ মার্চ থেকে। আর ঈদের পরদিন ২২ মার্চ থেকেই জ্বালানি তেলের সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। বান্দরবানের জেলা শহরে মোট চারটি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে একটি পুরোপুরি জ্বালানিশূন্য হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। আরেকটিতে অকটেনের সরবরাহ একেবারেই নেই। বাকি দুটি স্টেশনে সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে স্থানীয় যানবাহনের পাশাপাশি পর্যটকদের ব্যবহৃত যানবাহনগুলো চরম সংকটে পড়েছে। সাধারণত পর্যটন মৌসুমে বাড়তি চাহিদা মাথায় রেখে ফিলিং স্টেশনগুলো অতিরিক্ত মজুত রাখে। কিন্তু এবার পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও কম এসেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

পাহাড়িকা ফিলিং স্টেশনের মালিক সুব্রত দাশ জানান, বুধবার তাঁরা মাত্র চার হাজার লিটার করে ডিজেল ও অকটেন পেয়েছেন। এই সীমিত সরবরাহ থেকে মোটরসাইকেলকে ২০০ টাকার অকটেন, চাঁদের গাড়িকে ১০ লিটার এবং বাসকে ২০ লিটার ডিজেল দেওয়া হচ্ছে। সরবরাহ না থাকায় কয়েক দিন পুরোপুরি জ্বালানি বিক্রি বন্ধ রাখতে হয়েছে।তিনি আরও বলেন, এমন সংকট আগে কখনো দেখা যায়নি। পর্যটকদের চাপ বাড়লেও সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো যথাযথভাবে তেল পাঠাতে পারছে না। ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটক উভয়পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পর্যটকদের একটি বড় অংশ মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়িতে বান্দরবান ভ্রমণে এসেছেন। একই সঙ্গে দূরপাল্লার বাসে আসা পর্যটকদের চলাচলের জন্য জেলায় পাঁচ শতাধিক চাঁদের গাড়ি (জিপ) এবং শতাধিক ছোট যানবাহন একসঙ্গে রাস্তায় নেমেছে। সব মিলিয়ে স্থানীয় যানবাহনেরতুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি গাড়ি সড়কে চলছে। এতে জ্বালানির চাহিদা হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। গাজীপুর থেকে মোটরসাইকেলে আসা পর্যটক আবদুল রাব্বি বলেন, তাঁরা চারটি মোটরসাইকেলে আটজন থানচি যাওয়ার জন্য বান্দরবানে পৌঁছেছেন। সংকটের খবর আগেই জেনে চট্টগ্রাম থেকে তেল নিয়ে এসেছেন। কিন্তু তাঁদের পরিচিত আরও দুটি দল জ্বালানি না পেয়ে জেলা শহর থেকেই ফিরে গেছে। এমন ঘটনায় অনেক পর্যটকের ছুটির পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে থানচি এলাকার নৌযান চলাচলে। স্থানীয় ট্যুরিস্ট গাইডরা জানান, তেলের অভাব দেখিয়ে থানচি থেকে তিন্দু ও রেমাক্রীগামী যন্ত্রচালিত নৌকার ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। আগে নৌকাগুলো দিনে দুবার যাতায়াত করলেও এখন জ্বালানির সীমাবদ্ধতায় একবার করে চলছে। থানচি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কানন সরকার বলেন, জ্বালানির দাম বাড়েনি। তবে সরবরাহ কম থাকায় নৌকাগুলোর চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে ভাড়া কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে পর্যটকদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। অনেকে দূরের দর্শনীয় স্থানে যেতে পারছেন না।

জেলা হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জসীম উদ্দিন জানান, আজ শুক্রবার ও আগামীকাল শনিবারের পর পর্যটকের চাপ অনেকটা কমে যাবে। তখন যানবাহনের জ্বালানির চাহিদাও স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, আগামী সোমবার থেকে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (পর্যটন) এস এম হাসান বলেন, জেলায় জ্বালানি তেলের প্রকৃত কোনো সংকট নেই। টানা ছুটিতে পর্যটকের চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে সাময়িক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, প্রশাসন ইতোমধ্যে সরবরাহকারী কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। দুই-এক দিনের মধ্যেই অতিরিক্ত তেল সরবরাহ শুরু হবে।

এই সংকটের কারণে বান্দরবানের পর্যটন শিল্পে সাময়িক ধাক্কা লাগলেও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আশাবাদী। তাঁরা বলছেন, পর্যটকদের সংখ্যা এবার রেকর্ড ছাড়িয়েছে। যদি জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান হয়, তাহলে আগামী সপ্তাহে আরও বেশি পর্যটক আসবেন বলে আশা করা যায়। তবে বর্তমানে যারা আছেন, তাঁদের জন্য এই অভিজ্ঞতা স্মরণীয় হয়ে থাকবে—যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে জ্বালানির অভাব নিয়ে। প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপে যাতে এই সংকট কেটে যায় এবং পর্যটকরা নির্বিঘ্নে তাদের ছুটি উপভোগ করতে পারেন, সেদিকে সবার দৃষ্টি। বান্দরবানের এই পরিস্থিতি শুধু স্থানীয় নয়, সারা দেশের পর্যটন নীতির জন্যও একটি শিক্ষা হয়ে থাকবে।

Read Previous

ঈদ আনন্দে উচ্ছ্বসিত নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্ক, দর্শনার্থীদের ঢল নেমেছে

Read Next

কাওয়াই দ্বীপের প্রত্যন্ত সৈকতে পর্যটকবাহী হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, নিহত ৩

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular