
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটক সংবাদ : পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটির দ্বিতীয় দিন, ২২ মার্চ সকালের ভোর থেকেই কক্সবাজারের বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের ঢল নেমেছে। সূর্য উদয়ের সাথে সাথে হাজার হাজার পর্যটক সমুদ্রের নীল জলে পা ডুবিয়ে, ছবি তুলে এবং সকালের ঠান্ডা হাওয়ায় মেতে উঠেছেন। কক্সবাজারের কলাতলী, সুগন্ধা এবং লাবণী পয়েন্ট এলাকায় মানুষের ভিড় এতটাই বেড়েছে যে পা ফেলার জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন। রমজানের ধীরগতির পর এই ঈদের লম্বা ছুটিতে পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলো প্রায় শতভাগ পূর্ণ হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা এই অভাবনীয় সাড়ায় প্রচণ্ড খুশি। স্থানীয় দোকানপাট, রেস্টুরেন্ট ও সৈকতের আশপাশের ব্যবসা যেন উৎসবের আমেজে মেতে উঠেছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এবারের ঈদে অন্তত ৯ লাখ থেকে ১১ লাখ পর্যটকের আগমন ঘটবে। গত বছর ঈদুল ফিতরে প্রায় ৯ লাখ ৭০ হাজার পর্যটক এসেছিলেন। এবার দেশের স্থিতিশীল পরিস্থিতি ও টানা ৭-৮ দিনের ছুটির কারণে সংখ্যাটি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। শহরের ৫০০টিরও বেশি হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউসে ঈদের আগেই ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়ে গিয়েছিল। এখন দ্বিতীয় দিনেই বেশিরভাগ হোটেলের রুম পূর্ণ। কক্সবাজার হোটেল-মোটেল ও গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, “গত বছর ঈদে ৯ লাখ ৭০ হাজার পর্যটক এসেছিল। এবার দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকায় আমরা ১১ লাখ পর্যটকের আশা করছি।হোটেলগুলোতে দৈনিক ১ লাখ ৮৭ হাজার অতিথির ধারণক্ষমতা রয়েছে। ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকেই ভিড় শুরু হয়েছে এবং ২৯ মার্চ পর্যন্ত বুকিং চলছে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে।”
কলাতলী মেরিন ড্রাইভ হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান আরও বিস্তারিত বলেন, “রমজানে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিয়েও পর্যটক আসেনি। কিন্তু ঈদের ছুটিতে ৬০-৭০ শতাংশ বুকিং হয়ে গেছে। এখন দ্বিতীয় দিনেই প্রায় সব রুম ভর্তি। প্রতিদিন অন্তত এক লাখ পর্যটক থাকবেন বলে আশা করছি। এতে ব্যবসায়ীরা ভালো রাজস্ব পাবেন। আমরা বিশেষ ঈদ প্যাকেজও চালু করেছি যাতে পর্যটকরা আরও আকৃষ্ট হয়।” হোটেল কক্স টুডের ফ্রন্ট অফিস কর্মকর্তা ফাহমিদা হক দোলা জানান, “মার্চ ২০ থেকে বুকিং বাড়তে শুরু করেছে। ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকে পর্যটকদের আগমন ত্বরান্বিত হয়েছে। অনেকে পরিবার নিয়ে এসেছেন। আমরা সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি।”
সমুদ্রসৈকতে ভোরবেলায় যারা প্রথম পৌঁছেছেন তাদের মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা রাহাত হোসেন বলেন, “ঈদের দিন পরিবারের সাথে ঢাকায় কাটিয়ে দ্বিতীয় দিন সকালেই কক্সবাজারে চলে এসেছি। সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ আর সূর্যোদয়ের দৃশ্য দেখে মন ভরে গেছে। হোটেলে রুম পেতে একটু অসুবিধা হয়েছে কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে অসাধারণ অভিজ্ঞতা। পর্যটকদের এত ভিড় দেখে মনে হচ্ছে সারা বাংলাদেশ এখানে চলে এসেছে!” আরেক পর্যটক, চট্টগ্রামের সুমাইয়া আক্তার বলেন, “বাচ্চাদের নিয়ে এসেছি। সৈকতে সকাল থেকে খেলছে তারা। দোকান থেকে ফ্রেশ সি ফুড কিনে খাচ্ছি। হোটেলগুলো পূর্ণ থাকায় আমরা আগে থেকে বুক করেছিলাম। ব্যবসায়ীরা যেভাবে খুশি, তাতে বোঝা যায় এবারের ঈদ তাদের জন্য সোনার ঈদ হয়েছে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও এই ভিড়ে আনন্দিত। কলাতলী এলাকার একটি সি ফুড রেস্টুরেন্টের মালিক আবদুল্লাহ মিয়া জানান, “রমজানে দিনে ৫০-৬০ জন কাস্টমার আসত। আজ সকাল থেকেই ২০০-এর বেশি। সমুদ্রের মাছ, চিংড়ি আর কাঁকড়ার চাহিদা আকাশছোঁয়া। ঈদের ছুটিতে এমন ভিড় হলে আমাদের মাসের লোকসান পূরণ হয়ে যায়।” সৈকতের পাশের স্যুভেনির দোকানের মালিক রুবিনা বেগম বলেন, “শেল, টি-শার্ট, সানগ্লাস সবকিছু বিক্রি হচ্ছে দ্বিগুণ দামে। পর্যটকরা ছবি তুলে স্মৃতি রাখছেন। আমরা সবাই খুশি। প্রশাসন যেন নিরাপত্তা বজায় রাখে।”
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান বলেছেন, “পর্যটকদের স্বাগত জানাতে আমরা সব প্রস্তুতি নিয়েছি। হোটেল-মোটেল মালিকদের সাথে বৈঠক করে অতিরিক্ত ভাড়া না নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ন্যায্য দামে সেবা নিশ্চিত করা হবে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। পুলিশ ও টুরিস্ট পুলিশ সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।” স্থানীয় পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, “ভিড় নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে লাইফ গার্ড ও মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।”
কক্সবাজারের আকর্ষণ শুধু সমুদ্রসৈকতেই সীমাবদ্ধ নয়। পর্যটকরা হিমছড়ি, ইনানী, রামু বৌদ্ধ মন্দির, আগুনের পাহাড় ও মেরিন ড্রাইভ সড়ক ঘুরে দেখছেন। অনেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের ট্যুরও বুক করছেন। এই ঈদে পর্যটন খাতের এই প্রাণচাঞ্চল্য স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখবে। হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহন, দোকানপাট ও স্থানীয় কারিগররা সবাই উপকৃত হচ্ছেন। গত বছরের তুলনায় এবারের প্রত্যাশা আরও বেশি। পর্যটকদের আগমন অব্যাহত থাকলে মোট আয় কয়েকশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই ভিড়ের মাঝে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ট্রাফিক জ্যাম, পার্কিং সমস্যা ও আবর্জনা ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্থানীয়রা সতর্ক করেছেন। প্রশাসন বলছে, এসব সমস্যা সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পর্যটকদেরও অনুরোধ করা হয়েছে পরিবেশ রক্ষা করতে এবং নিয়ম মেনে চলতে। কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, “৭-৮ লাখ পর্যটকের আশা করছি। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পর্যটন খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।”
ঈদুল ফিতরের এই ছুটিতে কক্সবাজার যেন এক উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সৈকতে আলোকিত আতশবাজি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও লাইভ মিউজিকের আয়োজন চলছে অনেক হোটেলে। পর্যটকরা বলছেন, এমন সুন্দর পরিবেশে ঈদ উদযাপন করা সত্যিই স্মরণীয়। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, এই গতি ঈদের পরেও বজায় থাকবে। কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পের এই পুনরুজ্জীবন দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সব মিলিয়ে ঈদুল ফিতরের দ্বিতীয় দিন থেকে শুরু হওয়া এই পর্যটক ঢলে কক্সবাজারের আকাশ-বাতাস যেন পর্যটকদের হাসিতে ভরে গেছে। হোটেল মালিক, দোকানদার, পর্যটক সবাই একসুরে বলছেন—এবারের ঈদ সত্যিই সবার জন্য আনন্দের। প্রশাসনের সতর্কতা ও সহযোগিতায় এই উৎসব নিরাপদ ও স্মরণীয় হয়ে উঠুক—এটাই সকলের প্রত্যাশা। কক্সবাজারের এই উপচে পড়া ভিড় শুধু একটি ছুটির মুহূর্ত নয়, এটি দেশের পর্যটন সম্ভাবনার উজ্জ্বল প্রমাণও বটে।
প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ



