রমজানের নির্জনতায় কক্সবাজার সৈকত: সর্বোচ্চ ছাড় সত্ত্বেও পর্যটকশূন্য বেলাভূমি, ব্যবসায়ীরা অপেক্ষায় ঈদের জোয়ার

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিনিধি। পর্যটন সংবাদ : পবিত্র রমজান মাসের শেষ পর্যায়ে এসে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার এখন প্রায় পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে। আত্মশুদ্ধি ও সিয়াম সাধনার এই মাস শুরু হওয়ার পর থেকেই সৈকতের সোনালি বালুকণায় যেখানে সাধারণত দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত থাকে, সেখানে এখন শুধু নীরবতা আর ঢেউয়ের গর্জন। বছরের অন্য সময়ে পর্যটকদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের, কিন্তু রমজানের এই এক মাসে চেয়ার-ছাতা সাজিয়ে, জেটস্কি-বিচবাইক প্রস্তুত রেখেও অপেক্ষা করতে হয়েছে শূন্যতার মাঝে। পাঁচ শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট সর্বোচ্চ মূল্যছাড় ঘোষণা করলেও প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি। ফলে সৈকতকেন্দ্রিক অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে, যা স্থানীয় হাজারো পরিবারের জীবিকায় সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।

সোমবার সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে ঘুরে দেখা গেছে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। যতদূর চোখ যায়, শত শত চেয়ার-ছাতা সারি সারি সাজানো, কিন্তু তাদের ছায়ায় বসার মতো কোনো দর্শনার্থী নেই। সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে বালুকণায়, মৃদু সমুদ্রবাতাস বইছে, অথচ পানিতে নামার মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা। কলাতলী, লাবণী, সুগন্ধা, সিগাল ও শৈবাল পয়েন্টসহ পুরো সৈকতজুড়ে এমন নির্জনতা বিরাজ করছে। সাধারণত শীত মৌসুম থেকে শুরু করে বছরের এগারো মাসই এখানে পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে, কিন্তু রমজানের পবিত্রতা মেনে অনেকেই এবার ভ্রমণ থেকে বিরত থেকেছেন। ফলে বিচের ব্যবসায়ীরা দিন কাটাচ্ছেন চরম অনিশ্চয়তায়। তবে সকলেই আশায় বুক বেঁধে আছেন যে শবেকদর ও ঈদের টানা দশ দিনের ছুটিতে আবারও প্রাণ ফিরে পাবে এই সৈকত, জমজমাট হয়ে উঠবে পর্যটন বাণিজ্য।

বিপদাপন্ন পর্যটকদের সেবায় নিয়োজিত লাইফগার্ড থেকে শুরু করে কিটকট চেয়ার চালক, ভ্রাম্যমাণ ফটোগ্রাফার, জেটস্কি-বিচবাইক চালক, ঘোড়াওয়ালা—সবাই প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকছেন। কিন্তু সওয়ারি মিলছে না। বিচবাইক চালক আহমেদ রহমান বলেন, “পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস এই বিচের সেবা। পর্যটক আসুক বা না আসুক, সেবার মনোভাব নিয়ে প্রতিদিন এখানে হাজির হতে হয়। কিন্তু গত এক মাস ধরে চরম দুর্দশায় কাটছে। পরিবার চালানোই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।” একই অবস্থা জেটস্কি চালক কামাল হোসেনের। তিনি জানান, “প্রতিদিন সকালে জেটস্কি নিয়ে সাগরে নামি। কিন্তু পর্যটকের সাড়া নেই। লাবণী ও সুগন্ধা পয়েন্টে হাতে গোনা কয়েকজন এলেও কেউ জেটস্কিতে চড়ছেন না। ভালো সময়ের অপেক্ষায় আছি।”

সৈকতের বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী রহিম উদ্দিন জানান, পর্যটক না থাকায় স্থবির হয়ে পড়েছে সৈকতকেন্দ্রিক সহস্রাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। শতাধিক ভ্রাম্যমাণ ফটোগ্রাফার ক্যামেরা হাতে বেকার বসে আছেন, ঘোড়াগুলো অলসভাবে দাঁড়িয়ে থাকছে, বিচবাইকগুলো এদিক-ওদিক ঘুরছে কিন্তু যাত্রী নেই। শামুক-ঝিনুক ও সামুদ্রিক পণ্যের দোকানগুলোতেও বিক্রি শূন্য। ঘোড়াওয়ালা ফজলু মিয়া বলেন, “সকাল হলেই ঘোড়া নিয়ে সৈকতে চলে আসি। এখনো আসছি, কিন্তু কোনো আয় নেই। ঘোড়ার খাবারের টাকা পর্যন্ত তুলতে পারছি না। সাধারণত রমজানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বেড়াতে আসতেন, কিন্তু এবার সেই সংখ্যা একেবারেই কম।”

ফটোগ্রাফার সাইফুল ইসলামের কথায় উঠে এসেছে আরও করুণ চিত্র। তিনি বলেন, “বিচের তিনটি পয়েন্টে শতাধিক ফটোগ্রাফার পর্যটকদের সেবা দিয়ে থাকি। অন্য সময়ে দৈনিক দেড়-দুই হাজার টাকা আয় হতো। কিন্তু পুরো রমজানে হাতখরচও উঠছে না। পর্যটকহীন সৈকতে খুব কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে।” শামুক-ঝিনুক বিক্রেতা আব্দুল করিম জানান, “রমজানে বিক্রি একেবারে শূন্য। দোকানের খরচ অন্য জায়গা থেকে ম্যানেজ করতে হচ্ছে। তবু আশায় প্রতিদিন দোকান খুলি।”

সী সেফ লাইফ সংস্থার কর্মী নুরুল হক বলেন, “শীত মৌসুমসহ বছরের প্রায় সব সময় সৈকতে পর্যটক থাকে। গোসলের সময় বিপদ থেকে রক্ষা করতে আমাদের অনেক পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু রমজানে পর্যটকশূন্যতা আমাদের কাজকে একঘেয়ে করে তুলেছে। নীল জলরাশিতে ঢেউ আছড়ে পড়ছে, কিন্তু মাড়ানোর মানুষ নেই। তবু নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা প্রতিদিন দায়িত্ব পালন করছি।”

কক্সবাজার হোটেল ও গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী জানান, “পাঁচ শতাধিক হোটেল-রিসোর্টে রমজানে ভালো ছাড় দেওয়া হয়। আগের বছরগুলোতে এ সুযোগ নিয়ে অনেকে আসতেন। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম হয়েছে।” তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের বিপণন ব্যবস্থাপক তানভীর আহমেদ বলেন, “রমজান হোটেলিয়াদের জন্য ব্যবসায়িক মাস নয়। এ সময়ে ঈদের প্রস্তুতি নেওয়া হয়—সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের কাজ চলে।স্বাভাবিকভাবেই অতিথি কম থাকে। তবে সুবিধার সর্বোচ্চ ডিসকাউন্ট ঘোষণা করা হয়। সাধারণ হোটেলে ৫০০-১০০০ টাকায় রুম পাওয়া যায়, তারকা হোটেলগুলো ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেয়। আগে ভিন্ন ধর্মের মানুষ বেশি আসতেন, কিন্তু এবার সংখ্যা কম। তবু আশা রাখছি ঈদের ছুটিতে সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।”

মেরিন ড্রাইভ হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, “রোজা শুরুর পর সর্বোচ্চ ছাড় দিয়েও অতিথি মেলেনি। পুরো রমজান সৈকত প্রায় শূন্য। ঈদের ছুটিতে চিরচেনা প্রাণ ফিরে পাবে বলে আশা করছি।” জেলা প্রশাসক এম এ রহিম বলেন, “রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। মুসলমানদের পাশাপাশি ভিন্ন ধর্মের মানুষও এর পবিত্রতা সম্মান করেন। এ মাসে নির্জনতা ও প্রকৃতির অন্যরূপে কক্সবাজার এক ভিন্ন চিত্র পেয়েছে। ঈদের ছুটিতে জমজমাট পর্যটন ব্যবসা ফিরলে আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতে।”

এই নির্জনতা কক্সবাজারের পর্যটন অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। হাজারো পরিবার যাদের জীবিকা সৈকতকেন্দ্রিক সেবার ওপর নির্ভরশীল, তাদের দৈনন্দিন জীবন এখন কষ্টের। রমজানের পবিত্রতা মেনে অনেকে ভ্রমণ স্থগিত রেখেছেন, যা একদিকে প্রশংসনীয়, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। তবে সবাই একমত যে ঈদের টানা ছুটিতে দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকরা ঢল নামবে। তখন আবারও গমগম করবে সৈকত, জেটস্কি-বিচবাইকের ইঞ্জিন গর্জন উঠবে, ফটোগ্রাফারদের ক্যামেরা ক্লিক করবে, হোটেলগুলোতে অতিথিদের ভিড় লাগবে।

কক্সবাজারের এই নির্জন রূপও যেন এক অন্যরকম আকর্ষণ। নীল সমুদ্র, সোনালি বালু, মৃদু বাতাস—সব মিলিয়ে এক শান্ত পরিবেশ। যারা এখন আসছেন, তারা হয়তো প্রকৃতির এই নীরব সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। কিন্তু ব্যবসায়ীদের চোখে এই শান্তি অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রতীক। তাই সকলেই চোখ রেখে আছেন ঈদের দিকে। আশা করা যায়, টানা ছুটির দিনগুলোতে কক্সবাজার আবার তার চিরচেনা রূপে ফিরে আসবে, পর্যটন বাণিজ্য জমজমাট হয়ে উঠবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হবে। রমজানের এই নির্জনতা যেন শুধু একটি সাময়িক বিরতি হয়, যার পরেই আসবে প্রাণচাঞ্চল্যের জোয়ার।

প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ

Read Previous

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আরও ২৬টি ফ্লাইট বাতিল

Read Next

পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে পর্যটকদের উৎসাহী আগমন: মৌলভীবাজারের চায়ের রাজ্যে বুকিংয়ের ধুম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular