
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন মাইলফলক স্থাপিত হয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব আফরোজ খানমের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন আজ বিমান পরিবহন খাতের উন্নয়নে দু’দেশের সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিভিন্ন সম্ভাব্য পথ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সচিবালয়ের মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাতও উপস্থিত ছিলেন। সরকারি এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বৈঠকে উভয় পক্ষই ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও গভীর ও বহুমুখী করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেশের বিমান চলাচল খাতের আধুনিকীকরণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানের পরিষেবা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই খাতকে বিশ্বমানের করে তোলার লক্ষ্যে মার্কিন প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বৈঠকে ওয়াশিংটনের অব্যাহত সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলো এগিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদান করতে প্রস্তুত। বিশেষ করে বিমানবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন, এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের আধুনিকায়ন, পাইলট ও প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার ক্ষেত্রে মার্কিন সহায়তা আরও বেগবান করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন রাষ্ট্রদূত। এছাড়া পর্যটন খাতের সঙ্গে বিমান পরিবহনের সমন্বয় বাড়িয়ে দু’দেশের মধ্যে যাত্রী ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছে।
এই সাক্ষাৎকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দেশের বিমান চলাচল খাত বর্তমানে দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর পাশাপাশি নতুন এয়ারলাইন্সের অনুমোদন, আকাশপথে নতুন গন্তব্য যুক্ত করা এবং পর্যটকদের জন্য সহজ ভিসা প্রক্রিয়া চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত দেশের সহযোগিতা পেলে বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টর বিশ্বের সঙ্গে আরও সহজে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প, ওষুধ রপ্তানি এবং কৃষিজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে দ্রুত ও নিরাপদ বিমান পরিবহন অত্যন্ত জরুরি।
প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত বৈঠকে বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার বিমান পরিবহন খাতকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই সহযোগিতা শুধু অবকাঠামো উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দক্ষ জনবল তৈরি, নিরাপত্তা মানোন্নয়ন এবং পর্যটন প্রচারণায়ও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই আলোচনার ফলাফল শিগগিরই বাস্তবায়ন শুরু হবে এবং দু’দেশের মধ্যে যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। সরাসরি ফ্লাইট বৃদ্ধি পেলে ব্যবসায়ী, পর্যটক ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াত আরও সহজ ও সাশ্রয়ী হবে।
বৈঠকে আরও আলোচনা হয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবুজ বিমান পরিবহন প্রযুক্তি গ্রহণে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোতে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং আধুনিক নেভিগেশন সিস্টেম চালু করার বিষয়েও মার্কিন সহায়তার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হয়েছে। এছাড়া মানবসম্পদ উন্নয়নে যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, সিমুলেটর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং নারী পাইলটদের বিশেষ উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করার বিষয়েও উভয় পক্ষ একমত হয়েছে।
এই সাক্ষাতের ফলে বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টরে নতুন বিনিয়োগের দ্বার উন্মুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি মার্কিন কোম্পানি বাংলাদেশের বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সরকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ ভিশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিজিটাল এয়ারপোর্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, অনলাইন বোর্ডিং এবং যাত্রী নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও এই বৈঠকে উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে এই সৌজন্য সাক্ষাৎ শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতাই বাড়াবে না, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে।
দু’দেশের মধ্যে এমন সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আগামী মাসগুলোতে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করে নির্দিষ্ট প্রকল্প চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই উদ্যোগ বাংলাদেশকে এশিয়ার অন্যতম এভিয়েশন হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।



