মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে হাজারো যাত্রীর চরম দুর্ভোগ: শতাধিক ফ্লাইট বাতিল

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত কয়েকদিন ধরে যেন যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র ফুটে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশ থেকে গালফভিত্তিক অসংখ্য ফ্লাইট বাতিল হয়ে যাওয়ায় হাজারো বিমান যাত্রী চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। যারা কর্মস্থলে যোগদান বা ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পরিবার-পরিজন নিয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন, তাদের স্বপ্ন যেন হঠাৎ করেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। শুধু যাত্রীরাই নয়, গ্রাম থেকে বিদায় জানাতে আসা স্বজনরাও এখন বিমানবন্দরের লাউঞ্জ ও বাইরের ফুটপাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। খাবার-পানি, বিশ্রামের অভাবে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এই অবস্থায় যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা চরমে পৌঁছেছে।

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, গত এক সপ্তাহে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনগামী অন্তত ১৫০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ ও ফ্লাই দুবাইয়ের ফ্লাইটগুলো সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত। যাত্রীরা জানান, তারা টিকিট কেটে, ভিসা নিয়ে, এমনকি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিদায়ী অনুষ্ঠান করে বিমানবন্দরে এসে জানতে পারেন ফ্লাইট বাতিল। ৩৫ বছর বয়সী রাজশাহীর বাসিন্দা মো. রহিম উদ্দিন বলেন, “আমি দুবাইয়ে একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। ছুটি শেষ করে ফিরছিলাম। স্ত্রী-সন্তানসহ গ্রাম থেকে ১৫ জন আত্মীয় এসেছিল বিদায় জানাতে। এখন সবাই বিমানবন্দরের বাইরে বসে আছে। হোটেলে থাকার টাকাও নেই। কবে ফ্লাইট ছাড়বে কেউ বলতে পারছে না।”

একই অবস্থা চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনা থেকে আসা যাত্রীদেরও। অনেকে প্রবাসী শ্রমিক যারা মাসের পর মাস পরিবারের ভরণপোষণ চালান, তারা এখন আটকে পড়ে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। এয়ার কন্ডিশনিং বন্ধ থাকায় গরমে হাঁপিয়ে উঠছেন যাত্রীরা। খাবারের দোকানগুলোতে লম্বা লাইন, দামও বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। অনেক নারী ও শিশু যাত্রী মেঝেতে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। একজন নারী যাত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার স্বামী কুয়েতে আছেন। আমি ছেলেকে নিয়ে তার কাছে যাচ্ছিলাম। এখন বিমানবন্দরেই দুই দিন ধরে আটকে আছি। ছেলের জ্বর হয়েছে, ওষুধও পাচ্ছি না।”

এই দুর্ভোগের পেছনে মূল কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের পর থেকে আকাশপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। অনেক এয়ারলাইন্স ইরান, ইরাক ও সিরিয়ার আকাশসীমা এড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে ফ্লাইটের সময়সূচি পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে গেছে। বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি মনিটরিং করছে এবং আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তবে বাতিল ফ্লাইটের যাত্রীদের বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা আসেনি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যুদ্ধের কারণে আমরা নিজেরাও ক্ষতিগ্রস্ত। যাত্রীদের টিকিট রিফান্ড বা রিশিডিউল করার চেষ্টা চলছে, কিন্তু নতুন ফ্লাইটের স্লট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।”

এই সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাবও গুরুতর। বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের এক বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। প্রতি বছর লাখ লাখ শ্রমিক সেখানে কাজ করেন। ফ্লাইট বাতিলের কারণে অনেকে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। পরিবারগুলোতে অর্থ সংকট দেখা দিয়েছে। সিলেটের এক যাত্রী মো. আব্দুল করিম জানান, “আমার ছেলে দুবাইয়ে পড়াশোনা করে। তার সেমিস্টার ফি দেওয়ার জন্য আমি টাকা নিয়ে যাচ্ছিলাম। এখন সব আটকে গেছে। বাড়িতে বউ-মেয়ে অপেক্ষা করছে।” এদিকে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত স্বেচ্ছাসেবক ও চিকিৎসক মোতায়েন করেছে। তবে যাত্রীদের দাবি, এটি যথেষ্ট নয়। তারা সরকারের কাছে দ্রুত বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা এবং আটকে পড়া যাত্রীদের জন্য খাবার-থাকার সুবিধা চাইছেন।

যুদ্ধের এই প্রভাব শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। পুরো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেই একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের মতো প্রবাসীশ্রমনির্ভর দেশে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, আকাশপথে সংকটও তত বাড়বে। আপাতত যাত্রীদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, ফ্লাইটের সর্বশেষ আপডেট নিয়ে বিমানবন্দরে আসতে। কিন্তু গ্রাম থেকে দূর-দূরান্ত থেকে আসা স্বজনদের জন্য এটি কোনো সমাধান নয়। অনেকেই এখন ট্রেন বা বাসে করে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ আশা নিয়ে অপেক্ষা করছেন।

সরকারের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ রাখছে যাতে দ্রুত ফ্লাইট চালু হয়। তবে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ এখনও দৃশ্যমান নয়। এই পরিস্থিতিতে বিমানবন্দরে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো খাবার বিতরণ শুরু করেছে। স্থানীয় মসজিদ ও মাদ্রাসা থেকেও সাহায্য আসছে। কিন্তু এগুলো সাময়িক সমাধান মাত্র। যুদ্ধ যদি না থামে, তাহলে এই দুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে যাত্রীদের একাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, শত শত মানুষ লাগেজ নিয়ে বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষা করছেন। একটি ভিডিওতে এক বৃদ্ধা কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, “আমার ছেলে সৌদিতে। আমাকে দেখতে আসবে বলে টিকিট কেটেছিলাম। এখন কী হবে?” এমন হাজারো গল্প প্রতিদিন বিমানবন্দরে তৈরি হচ্ছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুধু সেখানকার মানুষকেই নয়, হাজারো মাইল দূরের বাংলাদেশি যাত্রীদের জীবনও বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কিছু ফ্লাইট পুনরায় চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যাত্রীদের মধ্যে আশা-নিরাশার দোলাচলে এখনও স্পষ্ট কোনো স্বস্তি নেই। এই সংকটের সমাধানে সরকার, এয়ারলাইন্স ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় হাজারো বাংলাদেশি পরিবারের স্বপ্ন ও জীবিকা আরও বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। বিমানবন্দরের এই দৃশ্য যেন যুদ্ধের আরেকটি নীরব শিকারের গল্প বলছে।

Read Previous

বাংলাদেশ-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিমান পরিবহন খাতে নতুন যুগের সহযোগিতা: রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেনের সৌজন্য সাক্ষাতে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি

Read Next

মধ্যপ্রাচ্যের ছয় গন্তব্যে বিমানের ফ্লাইট স্থগিত, যাত্রীদের সুরক্ষায় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular