
সেন্টমাার্টন দ্বীপ, ফাইল ছবি
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন আজ গুরুতর পরিবেশগত সংকটে। বছরের পর বছর লাগামহীন পর্যটন, অব্যবস্থাপনা আর স্বল্পমেয়াদি লাভের চিন্তা মিলিয়ে দ্বীপটির স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সরকার সেন্ট মার্টিনে নিয়ন্ত্রিত পর্যটন চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রস্তাবিত খসড়া মহাপরিকল্পনায় দ্বীপের চার কিলোমিটারের মধ্যে পর্যটকদের চলাচল সীমিত করা, পর্যটক সংখ্যা নির্ধারণ এবং সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে কঠোর নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে।
পরিবেশ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগে সেন্ট মার্টিনে প্রতিদিন গড়ে সাত হাজারের বেশি পর্যটক রাত যাপন করতেন। অথচ পরিবেশবিদদের মতে, এই দ্বীপের ধারণক্ষমতা তার অর্ধেকেরও কম। অতিরিক্ত মানুষের চাপের কারণে প্রবাল সংগ্রহ বেড়েছে, নৌযান থেকে তেল ও বর্জ্য সমুদ্রে পড়েছে, সৈকতজুড়ে জমেছে প্লাস্টিক ও কঠিন আবর্জনা। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে প্রবাল, সামুদ্রিক মাছ, কাছিমসহ পুরো জীববৈচিত্র্যের ওপর।
একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, গত কয়েক দশকে সেন্ট মার্টিনের প্রবাল প্রজাতির সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে গেছে। আশির দশকে যেখানে শতাধিক প্রবাল প্রজাতি পাওয়া যেত, সেখানে এখন টিকে আছে মাত্র কয়েক ডজন। গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দুই দশকের মধ্যেই দ্বীপটি কার্যত প্রবালশূন্য হয়ে পড়তে পারে। এই সতর্কবার্তাই মূলত সরকারকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
খসড়া মহাপরিকল্পনায় আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের সেন্ট মার্টিনকে চারটি আলাদা জোনে ভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই—মানুষের ব্যবহার আর প্রকৃতির সুরক্ষার মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্য তৈরি করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পর্যটকদের রাত যাপনের সুযোগ থাকবে মাত্র একটি নির্দিষ্ট এলাকায়। বাকি অংশগুলোতে থাকবে নিয়ন্ত্রিত বা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ কার্যক্রম।
প্রথম জোনকে ধরা হয়েছে সাধারণ ব্যবহার এলাকা হিসেবে। দ্বীপের অন্যান্য অংশে থাকা হোটেল ও রিসোর্ট ধাপে ধাপে এই জোনে স্থানান্তর করার কথা বলা হয়েছে। এখানেই পর্যটকেরা রাত কাটাতে পারবেন। তবে এখানেও নিয়ম থাকবে কড়াকড়ি। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৯০০ জনের বেশি পর্যটক রাত যাপন করতে পারবেন না। সৈকতে যানবাহন চলাচল, রাতে অতিরিক্ত আলো ব্যবহার, প্রবাল সংগ্রহ এবং যেকোনো ধরনের দূষণ নিষিদ্ধ থাকবে।
দ্বিতীয় জোন হবে নিয়ন্ত্রিত সম্পদ এলাকা। এটি মূলত দ্বীপের সংবেদনশীল অংশগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য একটি বাফার জোন হিসেবে কাজ করবে। এই এলাকায় নতুন কোনো পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ করা যাবে না। কৃষিকাজে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার, সৈকতে আগুন জ্বালানো কিংবা খোলা জায়গায় রান্নাবান্না সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। লক্ষ্য একটাই—প্রাকৃতিক ভারসাম্য যেন আর ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
তৃতীয় জোনকে ঘোষণা করার প্রস্তাব এসেছে টেকসই ব্যবস্থাপনা অঞ্চল হিসেবে। এই এলাকাকে সর্বোচ্চ সংরক্ষণের আওতায় আনা হবে। এখানে নতুন বসতি স্থাপন, স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা এমন কোনো কর্মকাণ্ড করা যাবে না, যা পরিবেশের ক্ষতি করে। ম্যানগ্রোভ বন, ছোট ল্যাগুন এবং সামুদ্রিক কাছিমের প্রজনন ক্ষেত্রগুলোকে বিশেষ সুরক্ষার তালিকায় রাখা হয়েছে।
চতুর্থ জোনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ছেঁড়াদিয়া দ্বীপের অংশবিশেষ। এই এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ সীমিত থাকবে। অনুমোদিত গবেষক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ছাড়া কেউ সেখানে যেতে পারবেন না। এমনকি দ্বীপের এক কিলোমিটারের মধ্যে মাছ ধরা, নৌযান ভেড়ানো কিংবা বন্য প্রাণীকে বিরক্ত করার মতো কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
পরিকল্পনাকারীদের একজন পরিবেশ গবেষক রাশেদ মাহমুদ বলেন, এই জোনিং ব্যবস্থা মূলত সেন্ট মার্টিনকে দীর্ঘমেয়াদে বাঁচিয়ে রাখার একটি কৌশল। তাঁর মতে, পর্যটক পুরো দ্বীপ ঘুরতে পারবেন দিনে, কিন্তু রাতে থাকতে হবে নির্দিষ্ট এলাকায়। এতে একদিকে পর্যটন থাকবে, অন্যদিকে প্রকৃতির ওপর চাপ কমবে। ছেঁড়াদিয়া দ্বীপের ক্ষেত্রে দূর থেকে দেখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, সেখানে পা রাখার সুযোগ নেই।
এই মহাপরিকল্পনার মেয়াদ ধরা হয়েছে দশ বছর। প্রথম পাঁচ বছরে মূল বাস্তবায়ন কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য প্রস্তাবিত ব্যয় প্রায় ৫৫ কোটি টাকা। পরবর্তী পাঁচ বছরে বাস্তবায়িত উদ্যোগগুলোর পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হবে।
তবে পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ স্থানীয় মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রশ্ন। সেন্ট মার্টিনে বর্তমানে প্রায় দেড় হাজার পরিবার বসবাস করে। মোট জনসংখ্যা প্রায় দশ হাজারের কাছাকাছি। এদের বড় একটি অংশ পর্যটন ও মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। মাসিক গড় আয় খুবই কম, আর দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারীর হার উদ্বেগজনক।
পর্যটন নিয়ন্ত্রণ করা হলে স্থানীয় মানুষের আয়ের ওপর প্রভাব পড়বে, এটা স্বীকার করছেন নীতিনির্ধারকেরাও। তাই মহাপরিকল্পনায় বিকল্প কর্মসংস্থানের কথা বলা হয়েছে। মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব কৃষি, স্থানীয় হস্তশিল্প এবং প্রশিক্ষণভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে দ্বীপবাসীর জন্য নতুন আয়ের পথ তৈরির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাজমুল হক বলেন, সংরক্ষণ আর মানুষের জীবনযাত্রা একসঙ্গে এগোতে হবে। একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটি সম্ভব নয়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো ভূমি ব্যবস্থাপনা। গত দুই দশকে হোটেল, রিসোর্ট আর অন্যান্য স্থাপনা বাড়তে বাড়তে দ্বীপের সবুজ আচ্ছাদন ও কৃষিজমি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা বন্ধ না করলে কোনো সংরক্ষণ পরিকল্পনাই টেকসই হবে না। তাই জমি হস্তান্তর, নির্মাণ অনুমোদন এবং ভূমির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা আরও শক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সালেহ উদ্দিন মনে করেন, সেন্ট মার্টিনের মতো সংকটাপন্ন এলাকাকে বাঁচাতে হলে আন্তর্জাতিক মানের সংরক্ষণ নীতিই একমাত্র পথ। তাঁর ভাষায়, অনেক দেশ পর্যটন বন্ধ রেখেও এমন দ্বীপ সংরক্ষণ করছে। বাংলাদেশ চাইলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মডেল গড়ে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে, সেন্ট মার্টিনের জন্য প্রস্তাবিত নিয়ন্ত্রিত পর্যটন পরিকল্পনা এক ধরনের শেষ সুযোগ। এখনই যদি কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো আর দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপকে তার আসল রূপে দেখতে পাবে না।



