এপ্রিলের মধ্যে পিআইএর বেসরকারিকরণ সম্পন্ন করতে চায় পাকিস্তান সরকার

পাকিস্তানি আন্তর্জাতিক বিমান

ছবি : সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স (পিআইএ) দীর্ঘদিনের লোকসান ও কাঠামোগত সংকট কাটিয়ে উঠতে এবার বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। পাকিস্তান সরকার আগামী বছরের এপ্রিলের মধ্যেই পিআইএকে নতুন বেসরকারি মালিকানার অধীনে হস্তান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সরকারের আশা, এই বেসরকারিকরণের মাধ্যমে বিমান সংস্থাটির আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এর অবস্থান পুনরুদ্ধার হবে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতামূলক নিলামে আরিফ হাবিব কর্পোরেশনের নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়াম পিআইএর ৭৫ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণের জন্য সর্বোচ্চ দর প্রদান করে। কনসোর্টিয়ামটির প্রস্তাবিত দর ছিল ১৩৫ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি, যা সরকারের নির্ধারিত ১০০ বিলিয়ন রুপির রিজার্ভ মূল্যকে উল্লেখযোগ্যভাবে ছাড়িয়ে যায়। এই দরপত্রের মাধ্যমে পুরো বিমান সংস্থাটির মূল্যায়ন দাঁড়ায় প্রায় ১৮০ বিলিয়ন রুপি, যেখানে সরকার বাকি ২৫ শতাংশ শেয়ার নিজের কাছে রাখবে।

এই বিজয়ী কনসোর্টিয়ামে আরিফ হাবিব কর্পোরেশনের পাশাপাশি ফাতিমা গ্রুপ, সিটি স্কুল এবং লেক সিটি হোল্ডিংসের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া, যোগ্যতার শর্ত পূরণ সাপেক্ষে একটি বিদেশি এয়ারলাইনসহ আরও দুই অংশীদারকে যুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারের মতে, এই অংশীদারিত্ব কাঠামো পিআইএর জন্য প্রয়োজনীয় নতুন মূলধন এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা দক্ষতা নিয়ে আসতে পারে।
পাকিস্তানের বেসরকারিকরণ উপদেষ্টা মুহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, এই লেনদেনের নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে শুধু মালিকানা পরিবর্তন নয়, বরং বিমান সংস্থাটির বাস্তব পরিচালন সক্ষমতাও শক্তিশালী হয়। তার ভাষায়, “আমরা এমন একটি মডেল চেয়েছি যেখানে পিআইএ নতুন বিনিয়োগ পাবে এবং একই সঙ্গে ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে।” তিনি আরও জানান, সরকারের ধারণা অনুযায়ী এই চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ১০ বিলিয়ন রুপি তাৎক্ষণিকভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হবে, যার বড় অংশই পিআইএর পুনর্গঠন ও টার্নঅ্যারাউন্ড পরিকল্পনায় বিনিয়োগ করা হবে।

তবে এই চুক্তি কার্যকর করতে এখনও বেশ কয়েকটি আনুষ্ঠানিক ধাপ বাকি রয়েছে। বেসরকারীকরণ কমিশনের বোর্ড এবং মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া গেলে তবেই চুক্তি স্বাক্ষর হবে। অনুমোদনের পর প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ করে প্রায় ৯০ দিনের মধ্যে আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মুহাম্মদ আলী জানান, যদি কোনো কারণে নির্বাচিত কনসোর্টিয়াম নির্ধারিত শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়, সে ক্ষেত্রে সরকার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতার সঙ্গে আলোচনায় যেতে পারবে।

চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, নতুন মালিকানার অধীনে অন্তত ১২ মাস পিআইএর বর্তমান কর্মীদের ধরে রাখতে হবে। সরকারের মতে, এটি কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিচালন ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে। উল্লেখযোগ্যভাবে, সাম্প্রতিক সময়ে স্বেচ্ছাসেবী অবসর কর্মসূচির মাধ্যমে পিআইএর জনবল কিছুটা কমানো হয়েছে, যার ফলে ব্যয় হ্রাস পেলেও কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, পিআইএর সাম্প্রতিক পুনর্গঠন উদ্যোগ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক রুট পুনরুদ্ধারে সহায়ক হয়েছে। বর্তমানে পিআইএ ম্যানচেস্টারে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে এবং বার্মিংহাম, লন্ডন ও নিউইয়র্কসহ আরও কয়েকটি ইউরোপীয় ও উত্তর আমেরিকান গন্তব্যে উড়ানের অনুমতি পেয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, পর্যাপ্ত উড়োজাহাজের অভাবের কারণে রুট সম্প্রসারণ এখনও সীমিত। এ কারণেই নতুন বিনিয়োগকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সরকার।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পুনর্গঠনের আগে পিআইএর বার্ষিক লোকসান ছিল প্রায় ৩৫ বিলিয়ন রুপি। নতুন বেসরকারিকরণ কাঠামোর মাধ্যমে মূলধন সংযোজন হলে এই লোকসান কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকার ২৫ শতাংশ শেয়ার রেখে ভবিষ্যতে লাভজনক অবস্থানে গেলে তার সুফল পাওয়ার সুযোগও রাখছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এই নিলাম প্রক্রিয়াকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, অতীতে বেসরকারিকরণে বিলম্বের কারণে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর বাড়তি চাপ পড়েছে। এবার স্বচ্ছ ও সময়বদ্ধ প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সরকারের আশা, পিআইএর বেসরকারিকরণ সফল হলে অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কারেও গতি আসবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা একটি জাতীয় সম্পদ নতুন করে ঘুরে দাঁড়ালে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এখন সব নজর এপ্রিল মাসের দিকে—এই সময়ের মধ্যেই পিআইএর নতুন অধ্যায় শুরু হবে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।

Read Previous

বাংলাদেশি ঐতিহ্যে বড়দিন: টাঙ্গাইলের শাড়িতে উৎসব উদযাপন করলেন ব্রিটিশ হাইকমিশনার

Read Next

খেজুরের রসের সুবাসে পর্যটনের নতুন ঠিকানা: চুয়াডাঙ্গার খেজুরতলা গ্রাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular