১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খেজুরের রসের সুবাসে পর্যটনের নতুন ঠিকানা: চুয়াডাঙ্গার খেজুরতলা গ্রাম

খেজুরতলা গ্রাম

খেজুরতলা গ্রাম চুয়াডাঙ্গা

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার এক শান্ত গ্রাম—খেজুরতলা। একসময় এই গ্রাম পরিচিত ছিল শুধু খেজুর গাছ আর শীতের মৌসুমি গুড় তৈরির জন্য। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে গাছিরা গাছে ওঠে, মাটির হাঁড়িতে টুপটাপ করে পড়ে খেজুরের রস—এই চিত্র গ্রামবাংলায় নতুন নয়। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন এই খেজুরতলাই হয়ে উঠছে পর্যটনের নতুন নাম। খেজুরের রস আর পাটালিগুড়কে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা দলে দলে ছুটে আসছেন এই গ্রামে। শুধু গুড় কিনতে নয়, দেখতে, জানতে, ছুঁয়ে দেখতে গ্রামবাংলার একেবারে খাঁটি জীবনধারা।

শীত এলেই খেজুরতলার বাতাসে ভেসে বেড়ায় এক ধরনের মিষ্টি গন্ধ। এই গন্ধ আসলে খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করা পাটালিগুড়ের। গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির উঠোনে তখন বসে গুড়ের হাঁড়ি। আগুনে জ্বাল দেওয়া রস ধীরে ধীরে ঘন হয়ে ওঠে, রঙ বদলায়, আর সেই সঙ্গে বদলায় গ্রামের চেহারাও। এখন এই সময়টাতেই সবচেয়ে বেশি পর্যটকের আনাগোনা। কেউ আসে বন্ধুদের নিয়ে, কেউ আবার আসে ক্যামেরা আর নোটবুক হাতে—গবেষণা, ডকুমেন্টেশন বা নিছক ভালোবাসা থেকে।

খেজুরতলার এই পরিবর্তনের পেছনে বড় কারণ খেজুর গুড়ের মান ও স্বাদ। এখানকার পাটালিগুড় দেশের নানা প্রান্তে পরিচিত। কোনো কেমিক্যাল নেই, নেই কৃত্রিম রং বা চিনি। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে তৈরি হওয়া এই গুড় এখন শহুরে মানুষের কাছে আলাদা কৌতূহলের বিষয়। ঢাকার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, বিশেষ করে পর্যটন, নৃবিজ্ঞান, ফুড টেকনোলজি ও ডিজাইন বিভাগের শিক্ষার্থীরা এই গ্রামকে বেছে নিচ্ছেন ফিল্ড স্টাডি আর অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য।

খেজুর গুড় প্রস্তুতকারক আব্দুল কুদ্দুস প্রায় ত্রিশ বছর ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “আগে আমরা শুধু হাটে গুড় বিক্রি করতাম। এখন ঢাকা থেকে মানুষ আসে আমাদের বাড়িতে। নিজের চোখে দেখে গুড় বানানো, আমাদের সঙ্গে গল্প করে, ছবি তোলে। এতে আমাদেরও ভালো লাগে। আয়ও একটু বেড়েছে।” তার মতে, পর্যটক আসায় গ্রামের মানুষ এখন নিজের কাজকে নতুন চোখে দেখতে শিখছে। আগে যেটা ছিল শুধু জীবিকার উপায়, এখন সেটাই হয়ে উঠেছে গ্রামের পরিচয়।

খেজুর রস সংগ্রহকারীরা, যাদের স্থানীয় ভাষায় বলা হয় গাছি, তারাই এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল ভরকেন্দ্র। ভোরের অন্ধকারে, কখনো ঠান্ডা কুয়াশার মধ্যে, তারা খেজুর গাছে ওঠে। গাছি রহিম উদ্দিন বলেন, “এই কাজ সহজ না। গাছে ওঠা, হাঁড়ি লাগানো, আবার নামানো—সবই ঝুঁকির। কিন্তু এখন যখন দেখি দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আমাদের কাজ দেখতে আসে, তখন গর্ব হয়।” তিনি আরও জানান, আগে অনেক তরুণ এই পেশা ছাড়তে চাইত। এখন পর্যটকদের আগ্রহ দেখে নতুন প্রজন্ম আবার উৎসাহ পাচ্ছে।

পর্যটকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে ঢাকার বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। শান্ত মরিয়ম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাশন ডিজাইনিং বিভাগের ছাত্রী সাবরী মিলার খেজুরতলা সফরের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে বলেন, “আমি গ্রামবাংলার এই রকম একটি জীবন্ত সংস্কৃতি খুব কাছ থেকে দেখতে চেয়েছিলাম। খেজুরের রস সংগ্রহ থেকে শুরু করে গুড় বানানো—পুরো প্রক্রিয়াটাই ভীষণ নান্দনিক। আমার ডিজাইনের ভাবনায় এই অভিজ্ঞতা বড় প্রভাব ফেলবে। রঙ, টেক্সচার, মানুষের জীবনযাপন—সবকিছু খুব অনুপ্রেরণাদায়ক।” তার মতে, এ ধরনের গ্রামভিত্তিক পর্যটন শুধু বিনোদন নয়, শিক্ষারও বড় মাধ্যম হতে পারে।

খেজুরতলায় ঘুরতে আসা পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায়, তারা এখানে শুধু পণ্য কিনতে আসেন না। তারা আসেন গল্প শুনতে, মানুষের জীবন জানতে, স্থানীয় খাবার খেতে। গ্রামের নারীরাও এখন পর্যটকদের জন্য পিঠা-পায়েস, গুড়ের তৈরি নানা খাবার বানাচ্ছেন। এতে গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন একটি চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। ছোট পরিসরে হলেও হোমস্টে ভাবনাও আস্তে আস্তে আলোচনায় আসছে।

জেলা প্রশাসনের নজরও পড়েছে এই পরিবর্তনের দিকে। চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক বলেন, “খেজুরতলা গ্রামের এই স্বতঃস্ফূর্ত পর্যটন প্রবণতা আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক। আমরা চাই এটি যেন টেকসই হয়। স্থানীয় মানুষের ক্ষতি না করে, তাদের আয় বাড়িয়ে কীভাবে এই পর্যটনকে পরিকল্পিত করা যায়, সে বিষয়ে ভাবছি।” তিনি আরও জানান, প্রাথমিকভাবে গ্রামে যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।

এই গ্রামে আসা পর্যটকদের বড় একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও শেয়ার করছেন। এতে খেজুরতলার নাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকেই বলছেন, এই জায়গা এখন ‘লাইভ মিউজিয়াম’—যেখানে গ্রামবাংলার একেবারে বাস্তব জীবন দেখা যায়, কোনো সাজানো প্রদর্শনী ছাড়াই। তবে স্থানীয়রা সতর্কও। তারা চান না, অতিরিক্ত ভিড়ে গ্রামের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হোক।

খেজুরতলার প্রবীণ বাসিন্দারা মনে করেন, এই পর্যটন আগ্রহ যদি সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে গ্রামের তরুণদের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। স্থানীয়ভাবে কাজের সুযোগ তৈরি হবে। খেজুর গুড়, রস, পিঠা—সবকিছুই ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে আরও বড় বাজার পেতে পারে। তবে এর জন্য দরকার প্রশিক্ষণ, ন্যায্য মূল্য এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা।

ঢাকা থেকে আসা একদল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী জানান, তারা এখানে এসে শুধু প্রকৃতি নয়, মানুষের সঙ্গে সংযোগ খুঁজে পান। শহরের যান্ত্রিক জীবনের বাইরে এসে এই ধীর, পরিশ্রমী জীবন তাদের নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। কেউ কেউ আবার গবেষণার জন্য তথ্য সংগ্রহ করছেন—খেজুর গুড়ের পুষ্টিগুণ, ঐতিহ্যবাহী উৎপাদন পদ্ধতি, কিংবা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর ভূমিকা নিয়ে।
খেজুরতলার সন্ধ্যা নামে খুব শান্তভাবে। দিনের কোলাহল কমে এলে আগুনের পাশে বসে গুড় জ্বাল দেওয়ার শব্দ, মানুষের আলাপ, আর মিষ্টি গন্ধ মিলেমিশে এক আলাদা পরিবেশ তৈরি করে। পর্যটকরা তখনো বসে থাকে, কেউ ছবি তোলে, কেউ নোট নেয়, কেউ শুধু তাকিয়ে থাকে। এই তাকিয়ে থাকার মধ্যেই হয়তো তারা খুঁজে পায় শহরে হারিয়ে যাওয়া কোনো অনুভূতি।

সব মিলিয়ে খেজুরতলা গ্রাম এখন শুধু একটি গ্রাম নয়, হয়ে উঠছে একটি অভিজ্ঞতা। খেজুরের রস আর পাটালিগুড়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই পর্যটন সম্ভাবনা দেখিয়ে দিচ্ছে—বাংলাদেশের গ্রামগুলোই হতে পারে দেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন সম্পদ, যদি সেগুলোকে তাদের নিজস্ব পরিচয় নিয়ে এগোতে দেওয়া হয়। খেজুরতলার গল্প সেই সম্ভাবনারই এক জীবন্ত উদাহরণ।

প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ

Read Previous

এপ্রিলের মধ্যে পিআইএর বেসরকারিকরণ সম্পন্ন করতে চায় পাকিস্তান সরকার

Read Next

মনোনয়ন প্রক্রিয়া সহজ করতে শনিবারও খোলা থাকবে দেশের সব তফসিলি ব্যাংক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular