বিশ্ব পর্যটনে অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে নতুন অ্যাক্সেসিবিলিটি নির্দেশিকা প্রকাশ করল জাতিসংঘ পর্যটন

জাতিসংঘ পর্যটন

জাতিসংঘ পর্যটন

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বিশ্ব ভ্রমণশিল্প দ্রুত পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে—এই উন্নয়নের সুবিধা কি সবাই পাচ্ছে? আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দিবসকে সামনে রেখে জাতিসংঘ পর্যটন একদম সেই জায়গাটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে। সংস্থাটি বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ খাতকে আরও ন্যায়সঙ্গত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সর্বজনীন করার লক্ষ্য নিয়ে পর্যটন ব্যবসায়ীদের জন্য একটি নতুন অ্যাক্সেসিবিলিটি নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে।

নতুন এই নির্দেশিকায় সরাসরি বলা হয়েছে, যেকোনো দেশ, প্রতিষ্ঠান বা পর্যটন সেক্টরের যেকোনো অংশই চাইলে খুব সহজ এবং কম খরচে এমন পরিবর্তন আনতে পারে, যা ভ্রমণকে সবার জন্য নিরাপদ এবং সমানভাবে উপভোগ্য করে তুলবে।

পর্যটন খাতের জন্য পাঁচটি মূল দিকনির্দেশনা

নতুন নির্দেশিকায় পাঁচটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে, যা আবাসন প্রতিষ্ঠান, ভ্রমণ সংস্থা, এয়ারলাইন, ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি এবং সব ধরনের পর্যটন গন্তব্যের জন্য প্রযোজ্য।

লক্ষ্য একটাই—যে কেউ যেন সহজে, মর্যাদা নিয়ে এবং ঝামেলাহীনভাবে ভ্রমণ করতে পারে।

এর মধ্যে রয়েছে
• অবকাঠামোর ছোট কিন্তু কার্যকর আপগ্রেড
• কর্মীদের অ্যাক্সেসিবিলিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ
• প্রতিবন্ধী অতিথিদের জন্য ব্যবহার-বান্ধব পরিবেশ
• তথ্য ও সেবায় সমান প্রবেশাধিকার
• এবং ব্যবসার ব্র্যান্ড ইমেজকে আরও মানবিক ও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো

সংস্থার মতে, এগুলো শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়—ব্যবসার জন্যও বড় সুবিধা। কারণ, যত বেশি অ্যাক্সেসযোগ্য হবে একটি গন্তব্য বা সেবা, তত বড় হবে তাদের সম্ভাব্য বাজার।

“সবাইকে সুযোগ দিতে হবে”—জোর দিচ্ছে জাতিসংঘ পর্যটন

নির্দেশনা প্রকাশের সময় জাতিসংঘ পর্যটনের নির্বাহী পরিচালক জোরিৎসা উরোসেভিচ বলেন, বিশ্ব পর্যটন খাত এখন প্রবৃদ্ধির চূড়ায়। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ হবে, যখন সবাই এর সুযোগ পাবে।

তার ভাষায়, পর্যটনের বিস্তৃত এই বাজারে অনেক ব্যবসা এখনো অ্যাক্সেসিবিলিটিকে গুরুত্ব দেয় না। ফলে তারা শুধু সম্ভাব্য অতিথি হারায় না, বরং অভিযোগ, জরিমানা বা সরকারি সহায়তা হারানোর ঝুঁকিতেও থাকে।

উরোসেভিচ আরও বলেন, অ্যাক্সেসিবিলিটি কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি সেবা মানের মৌলিক অংশ হওয়া উচিত।

বিশ্বে ১.৩ বিলিয়নের বেশি মানুষ প্রবেশগম্যতার বাইরে

তথ্যটা কঠিন, কিন্তু বাস্তব।

বিশ্বজুড়ে প্রায় ১.৩ বিলিয়ন মানুষ গুরুতর প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেঁচে আছেন। শুধু তাই নয়—৬০ বছরের বেশি বয়সীদের প্রায় অর্ধেকই কোনো না কোনো শারীরিক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি।

এই বিশাল জনগোষ্ঠী ভ্রমণ করতে চায়, অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চায়, কিন্তু অ্যাক্সেসিবিলিটির অভাবে তারা অনেক ক্ষেত্রেই বাদ পড়ে যায়। জাতিসংঘ পর্যটনের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ভ্রমণকারীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এমন একটি বাজার সেগমেন্টের অংশ যারা ভ্রমণের সময় বিশেষ সুবিধা বা অতিরিক্ত অ্যাক্সেসিবিলিটি চায়।

যে কোনো পর্যটন ব্যবসার জন্য এই বাজারকে উপেক্ষা করা মানে নিজের আয় কমানো। গবেষণা বলছে, প্রতিবন্ধীতা-অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগীদের তুলনায়
• ২৮% বেশি রাজস্ব আয় করে
• দ্বিগুণ নিট মুনাফা অর্জন করে
• এবং কর্মী ধরে রাখার হারও বেশি

অর্থাৎ মানবিক কারণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক দিক থেকেও অ্যাক্সেসিবিলিটি লাভজনক।

ONCE ফাউন্ডেশনের সহায়তায় অ্যাক্সেসযোগ্য ফরম্যাট

নির্দেশিকাটি তৈরি হয়েছে স্পেনের বিখ্যাত ONCE ফাউন্ডেশনের সহায়তায়, যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তায় কাজ করছে। পুরো নির্দেশিকাই এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন যে কেউ সহজে ব্যবহার করতে পারে—যারা পড়তে পারেন, যারা দেখতে পান না, বা যারা ভিন্নভাবে তথ্য গ্রহণ করেন—সবাইয়ের কথা মাথায় রেখেই এর ডিজাইন তৈরি।

২০২৬ জুড়ে বিশ্বজুড়ে প্রচারণা

নির্দেশিকাটি দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে আগামী বছর ইকুয়েডর ও কিউবায় দুটি বড় ইভেন্ট আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি AWE (Agency for Business and Economic Development)-এর সঙ্গে যৌথভাবে ২০২৬ সালজুড়ে আরও প্রচারণা চলবে।

AWE-এর পরিচালক সুজান ফ্রিডরিখ এটিকে “ত্রিমুখী জয়” বলে অভিহিত করেছেন—শিল্পের উন্নতি, বৃহত্তর অন্তর্ভুক্তি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় অর্থনৈতিক সুযোগ।

বিশ্ব পর্যটন যেমন বদলাচ্ছে, তেমনি বদলাতে হবে এর কাঠামোকেও। ভ্রমণ সবার অধিকার। আর সেই অধিকার বাস্তবায়নে অ্যাক্সেসিবিলিটি এখন আর আলাদা উদ্যোগ নয়; এটি মূলধারার অংশ।

জাতিসংঘ পর্যটনের এই নতুন নির্দেশিকা মনে করিয়ে দিচ্ছে—একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ভ্রমণ খাত শুধু মানুষের জীবন বদলায় না, ব্যবসাকেও আরও উন্নত এবং মানবিক করে তোলে।

Read Previous

বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য বিশেষ লক্ষ্য: ২০২৬ সালে ৩ লাখ ভিজিটরের আশা মালয়েশিয়ার

Read Next

দুবাইয়ে চালু হলো বিশ্বের সর্বোচ্চ হোটেল ‘সিয়েল দুবাই’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular