
ছবি : সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : হরিণঘাটার গল্পটা একটু হতাশার। একসময় যেখানে মানুষের ভিড়ে নৌকার ইঞ্জিনের শব্দ হারিয়ে যেত, এখন সেখানে নীরবতা। বরগুনার পাথরঘাটায় অবস্থিত এই উপকূলীয় সৌন্দর্য—ঘন ম্যানগ্রোভ বন, চিত্রল হরিণের পাল, বানর, পাখির কলতান, নদীর মোহনা আর সাগরের ঢেউ—সবই আছে, শুধু নেই মানুষের আনাগোনা। আর সেই অনুপস্থিতির কারণটা খুব সহজ: অব্যবস্থাপনা আর দীর্ঘদিনের অবহেলা।
সম্ভাবনার স্থান, তদারকির অভাব
হরিণঘাটা বহুদিন ধরেই দেশের সম্ভাবনাময় ইকোট্যুরিজম জোন হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রকৃতির বৈচিত্র্য আর চমৎকার লোকেশন মিলিয়ে এটি কুয়াকাটার বিকল্প হিসেবে গড়ে উঠতে পারত। কয়েক বছর আগেও প্রতিদিন শতাধিক মানুষ এখানে আসতেন। কিন্তু কাঠের ফুট ট্রেইল জরাজীর্ণ হয়ে পড়া, ওয়াচ টাওয়ারের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা, বিশ্রামাগার ও ওয়াশরুম অচল হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলো পর্যটকদের আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে।
ফুট ট্রেইল ছিল এ স্পটের সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশ। পর্যটকরা এক কিলোমিটার কাঠের সেতুর মতো পথ ধরে বনের মধ্যে দিয়ে লালদিয়ার সমুদ্রচরে হাঁটতেন। এখন এই পথের বড় অংশই ভেঙে গেছে। যেকোনো মুহূর্তে পা পিছলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। ওয়াচ টাওয়ারের সিঁড়িতেও ফাটল। যেদিকে তাকানো যায়, অযত্নের চিহ্ন।
পর্যটকের অভিজ্ঞতা: সৌন্দর্য আছে, নিরাপত্তা নেই
ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা তাসীন হাসান জানালেন, হরিণঘাটার মতো প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য দেশের আর কোথাও পাওয়া যায় না। কিন্তু পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসার সাহস হচ্ছে না। বনের গভীরে পর্যটকদের জন্য কোনো নিরাপত্তা নেই, পথঘাট ভাঙা, ওয়াশরুমের অবস্থা ব্যবহার অযোগ্য।
আরেক পর্যটক আসমা আক্তার বললেন, “একদিকে নদীর মোহনা, আরেকদিকে সাগরের বাতাস—দৃশ্যটা অবিশ্বাস্য। কিন্তু ফুট ট্রেইল দিয়ে হাঁটা এখন বিপজ্জনক। বিশ্রামাগারগুলো প্রায় ভাঙা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কোনো ব্যবস্থা নেই। এ অবস্থায় আরেকবার আসার প্রশ্নই ওঠে না।”
২০১৩ সালের উন্নয়ন কাজ, আজ সব নষ্ট
বন বিভাগের তথ্য বলছে, ২০১৩ সালের শেষ দিকে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে পাঁচতলা পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, কাঠের ট্রেইল, চারটি বিশ্রামাগার, সেতু, বেঞ্চ এবং গণশৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল হরিণঘাটাকে উন্নত ইকোট্যুরিজম জোন হিসেবে দাঁড় করানো।
শুরুতে এসব নির্মাণকাজ বুক ভরে আশা জাগালেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ট্রেইলের কাঠ ভেঙে গেলে পরে সিমেন্ট দিয়ে পাটাতন তৈরি করা হয়, কিন্তু তাও বেশি দিন টেকেনি। এখন পুরো ট্রেইলটাই প্রায় অচল অবস্থায়।
পর্যটন বিশ্লেষকদের মন্তব্য
পর্যটন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরিণঘাটা খুব কম বিনিয়োগেই বড় পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হতে পারত। উপকূলীয় এলাকায় কর্মসংস্থান বাড়ত, স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হতো। কিন্তু ব্যবস্থাপনার অভাবে সুযোগটি হাতছাড়া হচ্ছে।
প্রশাসনের অবস্থান
পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান জানান, অন্তত প্রবেশদ্বার থেকে সেতু পর্যন্ত সংস্কারের জন্য জেলা পরিষদ তিন লাখ টাকা বাজেট দিয়েছে এবং দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। পাশাপাশি লালদিয়ায় কিছু উন্নয়ন কাজের পরিকল্পনাও চলছে।
তিনি স্বীকার করেন, বন বিভাগের জনবল কম থাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা সম্ভব হচ্ছে না। এখানে পুলিশের স্থায়ী টহল দরকার। কারও দ্বারা পর্যটক হয়রানির অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
কী করলে ঘুরে দাঁড়াবে হরিণঘাটা
হরিণঘাটা এখনও তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরে রেখেছে। যা দরকার তা হলো সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, নতুন করে ফুট ট্রেইলের নির্মাণ, ওয়াশরুম-টাওয়ার সংস্কার, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আর নিয়মিত তদারকি। এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে খুব অল্প সময়েই এখানে মানুষের ভিড় ফিরতে পারে।
হরিণঘাটা প্রমাণ করে যে কেবল অবকাঠামো নির্মাণ করলেই পর্যটন গড়ে ওঠে না। টেকসই পরিকল্পনা আর নিয়মিত যত্ন না থাকলে প্রকৃতির সৌন্দর্যও টিকতে পারে না। এখন সময় এসেছে এই সম্ভাবনাময় স্পটটিকে নতুন করে ভাবার।
প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার



