
ছবি : সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : দেশের পাসপোর্ট সেবা আধুনিক করতে সরকার নানা পদক্ষেপ নিলেও সব জায়গায় সমান ফল মিলছে না। কোথাও উন্নতি দ্রুত দৃশ্যমান, আবার কোথাও যেন পুরনো সমস্যাই আগের মতো রয়ে গেছে। কিশোরগঞ্জ ও লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের দুই ভিন্ন বাস্তবতায় সেই বৈপরীত্যই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
কিশোরগঞ্জে দালালদের দৌরাত্ম্য অটুট
কিশোরগঞ্জ অফিসে গেলে এখনো প্রথমেই চোখে পড়ে দালালদের সক্রিয় উপস্থিতি। অভিযোগ আছে, প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও সাধারণ আবেদনকারীদের আবেদন গ্রহণে নানা অজুহাত দেখানো হয়। ঠিক তখনই দালালরা এগিয়ে আসে, অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে “ঝামেলাহীন” সেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। যাদের কাগজপত্র অসম্পূর্ণ, তারাও দালালদের মাধ্যমে সহজে আবেদন অনুমোদন করাতে পারছে।
অফিসের এক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে দালালরা শুধু অতিরিক্ত অর্থই নেয় না, টাকা দিতে অস্বীকার করলে আবেদনকারীদের হুমকি বা হয়রানি করতেও পিছপা হয় না। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কিছু আনসার সদস্য দালালদের সাহায্য করছে — এমন অভিযোগও রয়েছে। প্রতিদিন তিন থেকে চারশ আবেদন প্রক্রিয়া হওয়ায় এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যে পরিমাণ অস্বচ্ছ লেনদেন হয়, তা নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ দীর্ঘদিনের।
লক্ষ্মীপুরে দালালমুক্ত পরিবেশ
অন্যদিকে লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে পরিস্থিতি পুরো বদলে গেছে। গত ৫ আগস্টের পর দালালদের প্রভাব প্রায় নেই বললেই চলে। অফিস কর্তৃপক্ষ নিয়মিত সচেতনতা কার্যক্রম চালিয়েছে, দেয়ালে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও প্রক্রিয়া সহজ ভাষায় তুলে ধরেছে। ফলে বহু আবেদনকারী এখন নিজ দায়িত্বেই আবেদন জমা দিচ্ছেন, আর আগের মতো বিভ্রান্তি বা অচলাবস্থা তৈরি হচ্ছে না।
অফিসের সহকারী পরিচালক একেএম আবু সাঈদ জানিয়েছেন, সঠিক তথ্য সহজভাবে তুলে ধরার ফলেই ভোগান্তি কমেছে। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই দ্রুত সেবা পাওয়ার অভিজ্ঞতা এখন অনেকের জন্যই স্বস্তির জায়গা।
পুরোনো সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে
দেশজুড়ে অনলাইনে আবেদন করতে গিয়ে অনেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে নামের অমিল, ব্যাংক পেমেন্টের ভুল অথবা পুরোনো পাসপোর্টের তথ্য নতুন ই-পাসপোর্ট সিস্টেমের সাথে না মেলা — এসব কারণে ঝামেলায় পড়েন। বিভিন্ন নামে একাধিক জন্ম নিবন্ধন থাকায় যাচাই প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে ওঠে। এসব জায়গাতেই দালালরা সুবিধা নেয়, দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে।
যদিও পুলিশ ভেরিফিকেশন বাদ দেওয়া হয়েছে, তবুও নথির অসঙ্গতি অনেক আবেদনকারীর জন্য বড় বাধা হয়ে রয়ে গেছে।
কিশোরগঞ্জে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের দাবি
কিশোরগঞ্জের মানুষ মনে করেন, নিয়ম বদলানোই যথেষ্ট নয়; অফিসের ভেতরের অনিয়ম থামাতে কঠোর নজরদারি দরকার। বিষয়টি বহুবার উচ্চপর্যায়ে জানানো হলেও এখনো কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাদের। স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া দালালমুক্ত পরিবেশ ফিরবে না — এটাই আবেদনকারীদের বক্তব্য।
একদিকে লক্ষ্মীপুরের মতো অফিসে দালালচক্র প্রায় বিলীন, অন্যদিকে কিশোরগঞ্জে তারাই আবার সর্বেসর্বা। এই দুই চিত্র দেখিয়ে দেয়, শুধু নীতিমালা নয়, মাঠপর্যায়ের দৃঢ়তা আর স্বচ্ছতা থাকলেই সেবা বদলে যেতে পারে। পাসপোর্ট অফিস দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকসেবা কেন্দ্রগুলোর একটি। এখানে দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত হলে জনগণের ভোগান্তি কমবে, আর দুর্নীতির পথও সংকুচিত হবে।



