টানা অষ্টমবারের মতো ‘বিশ্বের সেরা বিমান সংস্থা’ খেতাব ধরে রাখল এমিরেটস

ছবি : সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : আন্তর্জাতিক ভ্রমণ শিল্পে যে কয়েকটি পুরস্কার সত্যিকারের গ্রহণযোগ্যতা বহন করে, ULTRAs তাদের মধ্যে অন্যতম। আর এই মঞ্চে এমিরেটস আবারও নিজের আধিপত্য প্রমাণ করল। ১৭ নভেম্বর দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এবারের অনুষ্ঠানেই টানা অষ্টম বছরের মতো ‘বিশ্বের সেরা বিমান সংস্থা’ নির্বাচিত হয়েছে সংস্থাটি। এমন এক সময় যখন এয়ারলাইন প্রতিযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কঠিন, সেখানে একই খেতাব বছর ধরে ধরে রাখা নিঃসন্দেহে এমিরেটসের গুণমান, দৃষ্টিভঙ্গি আর যাত্রীসেবার প্রতি প্রতিশ্রুতির ফল।

এবারের ভোটে অংশ নিয়েছে আল্ট্রাট্রাভেলের ১২ লাখেরও বেশি আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারী। অর্থাৎ পুরস্কারটা জেতা মানে শুধুই বিচারকের টেবিল থেকে স্বীকৃতি পাওয়া নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিমানে ভ্রমণ করা মানুষদের সরাসরি বিশ্বাস অর্জন করা।

যে কারণে এমিরেটস আবারও সেরা

সবচেয়ে বড় কারণটি স্পষ্ট—এমিরেটস তাদের যাত্রীদের অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে পুরো ব্যবসাটা তৈরি করেছে। ১৫০টিরও বেশি গন্তব্যে ছড়িয়ে থাকা বিশাল নেটওয়ার্ক, আর তার সঙ্গে ফ্লিটে থাকা Airbus A380, A350 এবং Boeing 777–এই তিন ধরনের বিমানই আলাদা মানের স্বাদ দেয়। আরাম, নির্ভরযোগ্যতা আর ইন-ফ্লাইট কানেক্টিভিটি—এই তিন দিকেই এমিরেটস নিজেকে প্রতিবার আপগ্রেড করেছে।

কেবিনের অভিজ্ঞতার কথা বললে দুবাইভিত্তিক এয়ারলাইনটির সুনাম আলাদা করেই বলতে হয়। আঞ্চলিক স্বাদের খাবার, ICE নামের পুরস্কারপ্রাপ্ত বিনোদন ব্যবস্থা, আর তাতে থাকা ৬,৫০০টির বেশি চ্যানেল—এগুলো যাত্রীদের ভ্রমণকে আর দশটা ফ্লাইটের মতো রাখে না। আর বিজনেস এবং ফার্স্ট ক্লাসে যারা ভ্রমণ করেন, তারা জানেন অনবোর্ড লাউঞ্জ, শাওয়ার স্পা আর ব্যক্তিগত স্যুট কীভাবে উড়োজাহাজ ভ্রমণকে সম্পূর্ণ আলাদা এক উচ্চতায় নিয়ে যায়।

উদ্ভাবন শুধু কথার বিষয় নয়

একটা বিষয় পরিষ্কার—এমিরেটস কেবল বিমানের আসন বা খাবারের উন্নয়ন করে থেমে থাকে না। বিমানবন্দরে তাদের লাউঞ্জগুলো আলাদাভাবে প্রশংসা পায়। ড্রাইভার-ড্রাইভ সার্ভিস অনেক দেশের যাত্রীর জন্য ফ্লাইটে ওঠা আগেই যাত্রার স্বাচ্ছন্দ্য শুরু করে দেয়। ডিজিটাল সমাধানে তারা বেশ আগেই এগিয়ে যায়, আর টেকসই উদ্যোগেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় বিনিয়োগ করেছে।

আরেকটি জায়গায় কোম্পানিটি ধারাবাহিকভাবে জোর দিচ্ছে—কেবিন ক্রুদের প্রশিক্ষণ। যাত্রীদের সঙ্গে প্রতিটি কথোপকথন, প্রতিটি পরিষেবায় পেশাদারিত্ব বজায় রাখার পেছনে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাই ভূমিকা রাখে।

প্রিমিয়াম ইকোনমিতে নতুন মানদণ্ড

এ বছরের ULTRAs–এ এমিরেটস “সেরা প্রিমিয়াম ইকোনমি ক্লাসসহ এয়ারলাইন” পুরস্কারটিও পেয়েছে। এই কেবিন ক্লাস চালু হওয়ার পর থেকেই ভ্রমণকারীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে। প্রশস্ত ক্রিম-কালারের লেদার সিট, ৪০ ইঞ্চি পর্যন্ত সিট-পিচ, ফুটরেস্ট ও কাফ রেস্ট—সব মিলিয়ে যাত্রীরা ইকোনমির চাইতে অনেক আরাম পান, আবার বিজনেস ক্লাসের মতো ব্যয়ও হয় না। যাদের দীর্ঘ ভ্রমণ করতে হয়, তাদের জন্য প্রিমিয়াম ইকোনমি দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

১৩.৩ ইঞ্চির বড় স্ক্রিনে বিনোদন, উন্নত মানের খাবার, প্রিমিয়াম ওয়াইনের অপশন—এসবই এই ক্লাসকে আলাদা জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। এখন দুবাই থেকে বিশ্বের ৬১টি শহরে এই ক্লাসে ভ্রমণ করা যায়, এবং তালিকাটি আরও বাড়ছে।

টিম ক্লার্ক: এমিরেটসের বিকাশের পেছনের মানুষ

এ বছরের অনুষ্ঠানে আরেকটি মুহূর্ত বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো ছিল—এমিরেটসের প্রেসিডেন্ট স্যার টিম ক্লার্ককে দেওয়া ‘গ্লোবাল এভিয়েশনে আজীবন সম্মাননা’। বিমান শিল্পে তার অবদান কয়েক দশকজুড়ে বিস্তৃত। ১৯৭২ সালে ক্যারিয়ার শুরু, এরপর নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের পর ২০০৩ সালে তিনি এমিরেটসের প্রেসিডেন্ট হন।

তার নেতৃত্বেই দুবাইয়ের এই এয়ারলাইনটি মাত্র কয়েকটি রুট থেকে বেড়ে আন্তর্জাতিক আকাশপথে সবচেয়ে শক্তিশালী ক্যারিয়ারগুলোর একটিতে পরিণত হয়। উদ্ভাবনী বহর পরিকল্পনা, নতুন রুট খুলতে সাহসী সিদ্ধান্ত আর যাত্রীসেবায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ—এই তিনটি বিষয়ই এমিরেটসকে যে উচ্চতায় তুলেছে, তার পেছনে টিম ক্লার্কের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

ULTRAs কেন গুরুত্বপূর্ণ

ULTRA পুরস্কারগুলো ভ্রমণপ্রেমী এবং নিয়মিত আন্তর্জাতিক যাত্রীদের ভোটে নির্ধারিত হয়। ভ্রমণ শিল্পে যারা নিয়মিত অর্থ ব্যয় করেন, সিদ্ধান্ত নেন এবং সেবার মান নিয়ে বিচার করতে পারেন—মূলত তাদের মতামতেই এই পুরস্কার নির্ধারিত হয়। ২০২৫ সালে যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণে ব্যয়ের পরিমাণই এক বিলিয়ন ডলারের বেশি। তাই এই পুরস্কারের মূল্য শুধু মর্যাদার নয়, বাস্তব বাজারের প্রতিফলনও।

এমিরেটসের সামনে চ্যালেঞ্জ অবশ্যই আছে—বিশ্বব্যাপী বিমান সংস্থাগুলো এখন নিজেদের সেবার মান বাড়াতে প্রতিযোগিতায় লেগে আছে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে একই শীর্ষ খেতাব ধরে রাখা বলে দেয়, তারা এখনও খেলাটির সবচেয়ে শক্তিশালী খেলোয়াড়দের একজন।

এবারের পুরস্কার শুধু এমিরেটসের অর্জন নয়, বরং আন্তর্জাতিক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা কেমন হওয়া উচিত—তা আবারও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে দিল।

Read Previous

যুক্তরাষ্ট্রে কঠোর ভিসা নীতি: নানা অভিযোগে ৮০ হাজার বিদেশির ভিসা বাতিল

Read Next

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে উঠছে নতুন পর্যটন অঞ্চল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular