যুক্তরাষ্ট্রে কঠোর ভিসা নীতি: নানা অভিযোগে ৮০ হাজার বিদেশির ভিসা বাতিল

ফাইল ছবি

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা নীতির কড়াকড়ি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও তীব্র হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় ফিরে আসার পর গত দশ মাসে প্রায় ৮০ হাজার বিদেশির নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বাতিল করেছে—অভিযোগ বিভিন্ন ধরনের। কেউ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি, কেউ অপরাধে জড়িত, কেউ আবার ভিসার শর্ত ভঙ্গ করেছেন। সংখ্যাটা এত বড় যে অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশিদের জন্য বাতাস এখন আগের চেয়ে কঠিন।

এ সংখ্যার মধ্যেই শুধু স্টুডেন্ট ভিসাধারী আছেন প্রায় ৮ হাজার। যারা যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার্থী হিসেবে পড়ছিলেন, তাদের অনেকেই হঠাৎই জানতে পেরেছেন, তাঁদের ভিসা বাতিল হয়েছে। ঠিক কী কারণে, সেটা অনেক সময় স্পষ্টভাবে জানানোও হয় না।

হোয়াইট হাউসের সিনিয়র অ্যাডভাইজার স্টিফেন মিলার জানিয়েছেন, ভিসা বাতিলই শেষ নয়। প্রয়োজনে গ্রিনকার্ড পর্যন্ত বাতিল হতে পারে, এমনকি সিটিজেনশিপও প্রত্যাহার করার ঘটনা ঘটতে পারে। তাঁর কথায়, কেউ যদি চুরি-ডাকাতি, মারামারি, ছিনতাই, কিংবা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর মতো অপরাধে ধরা পড়ে, তবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অধিকার রাখে না। এখানে থাকতে চাইলে দেশের আইনকে সম্মান করতে হবে—এটাই প্রশাসনের অবস্থান।

একটু থেমে দেখা যাক, যুক্তরাষ্ট্র কার কাছে বিশেষভাবে কঠোর হচ্ছে। প্রশাসন বলছে, যে কেউ মার্কিন জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছে বা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র রাষ্ট্র—বিশেষ করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে যুক্ত, তাদের টার্গেট করা হচ্ছে। যারা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের ইমিগ্র্যান্ট এবং নন-ইমিগ্র্যান্ট—দুই ধরনের ভিসাই বাতিল করা হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু দেশের প্রতি কড়া নজরদারি নতুন কিছু নয়। এর আগে আফগানিস্তান, সুদান, ইয়েমেন, ইরান, মিয়ানমারসহ ১২ দেশের ওপর সরাসরি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ছিল। পাশাপাশি কিউবা, ভেনেজুয়েলা, তুর্কমেনিস্তানসহ কয়েকটি দেশের জন্য ভিসা ইস্যুতেও বিশেষ সতর্কতা আরোপ করেছে স্টেট ডিপার্টমেন্ট। সব মিলিয়ে বিশ্বের বহু নাগরিকের কাছে যুক্তরাষ্ট্র এখন অনেকটাই অনিশ্চিত গন্তব্য।

এখানেই শেষ নয়। মত প্রকাশের স্বাধীনতার দেশ হিসেবে পরিচিত মার্কিন সমাজেও এখন বিদেশিদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক দেখা যাচ্ছে। শুধু জনসমক্ষে নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কী বলা যায় আর কী বলা যায় না—এ নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যে। কারণ, সামান্য মন্তব্যও কখনো কখনো তদন্তের আওতায় পড়ছে। প্রশাসনের কোনো পদক্ষেপের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মন্তব্য পাওয়া গেলে তা ভিসা বাতিলের কারণ হিসেবে গণ্য হতে পারে—এমন ধারণাও ক্রমে ছড়িয়ে পড়ছে।

অনেক অভিবাসী জানিয়েছেন, বৈধ ভিসা থাকার পরও তাঁরা আইসের অভিযানে আটক হয়েছেন। এখানেই আতঙ্কের সবচেয়ে বড় অংশটি লুকিয়ে আছে। অভিবাসন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট আইসের অভিযান বাড়ছে বলেই বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা অভিযোগ তুলেছে। এসব অভিযোগের জবাবে স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, কিংবা যারা আইনের চোখে অপরাধী—তাদের ধরতেই অভিযান চালানো হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তাই সরকারের মূল লক্ষ্য—এটাই তাদের ব্যাখ্যা।

অভিযোগভেদে ভিসা বাতিলের হিসাব তুলে ধরলে পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হয়। গত দশ মাসে মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ১৬ হাজার ব্যক্তির ভিসা বাতিল হয়েছে। খুন-খারাপি বা গুরুতর সহিংস অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে বাতিল হয়েছে ১২ হাজার ভিসা। আর চুরি, ছিনতাই, রাহাজানির মতো অপরাধে ধরা পড়া প্রায় ৮ হাজার বিদেশির ভিসা বাতিল হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকেই অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে—এ কথা প্রকাশ্যে বলেছিল। তাই এসব অভিযানে চমকে যাওয়ার কিছু নেই। প্রশাসনের যুক্তি সহজ: যে বিদেশি মার্কিন আইনকে সম্মান করে না বা জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে, তাকে দেশে থাকার সুযোগ দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি পিগোট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজের আইন রক্ষায় কোনো ছাড় দেবে না। কেউ যদি আইন ভাঙে, নিরাপত্তায় হুমকি তৈরি করে বা অপরাধে জড়ায়—তাদের ভিসা বাতিল করতেই হবে।

সমষ্টিগতভাবে যা দেখা যাচ্ছে, তা হলো—যুক্তরাষ্ট্র এখন ভিসা ও অভিবাসন নীতিকে কঠোরভাবে পুনর্গঠন করছে। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা—সবকিছুকে সামনে রেখে নতুন বাস্তবতা তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে বহু বিদেশির জন্য যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো নিরাপদ বা নিশ্চিন্ত জায়গা নয়।

এই পরিবর্তনের ঢেউ আন্তর্জাতিক অভিবাসন প্রবাহকেও প্রভাবিত করছে। ভবিষ্যতে বিদেশিদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বা বসবাস আরও কঠিন হবে—এটাই এখন অনেকের অভিমত। তবে প্রশাসনের কথায়, যারা নিয়ম মেনে চলে, দেশের আইনকে সম্মান করে—তাদের জন্য উদ্বেগের কিছু নেই।

Read Previous

রামুর রাংকুট মহা বৌদ্ধবিহার: পর্যটনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার

Read Next

টানা অষ্টমবারের মতো ‘বিশ্বের সেরা বিমান সংস্থা’ খেতাব ধরে রাখল এমিরেটস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular