
ফাইল ছবি
নিজস্ব প্রতিবেদক |পর্যটন সংবাদ : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সম্প্রতি তাদের বহরের কারিগরি জটিলতা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সহায়তা চেয়েছে। সংস্থাটি এক মাসের জন্য অন্তত দুইজন বোয়িং ইঞ্জিনিয়ারকে বাংলাদেশে মোতায়েন করার অনুরোধ জানিয়েছে, যারা বিমানের অভ্যন্তরীণ ইঞ্জিনিয়ারিং টিমের সঙ্গে সরাসরি কাজ করবেন।
বিমানের সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু পুনরাবৃত্ত যান্ত্রিক ত্রুটি এবং রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত বিলম্ব দেখা দিয়েছে, যা নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে বোয়িংয়ের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা সরাসরি মাঠপর্যায়ে কাজ করলে সমস্যা শনাক্ত ও সমাধান দ্রুত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনটি।
সরাসরি সহায়তা চেয়েছে বিমান
বিমান কর্তৃপক্ষ জানায়, নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বোয়িংয়ের দক্ষিণ এশিয়া অফিসের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে এবং খুব শিগগিরই ইঞ্জিনিয়াররা ঢাকায় এসে কাজ শুরু করবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. মোহাম্মদ সফিকুর রহমান বলেন, “যাত্রীদের নিরাপত্তা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আমরা নিজেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, তবে বোয়িংয়ের ইঞ্জিনিয়াররা মাঠে থাকলে সমাধান আরও দ্রুত হবে। এতে শুধু সমস্যা মেটানোই নয়, ভবিষ্যতের রক্ষণাবেক্ষণ নীতিও আরও শক্তিশালী হবে।”
তদন্ত কমিটি ও অভ্যন্তরীণ সংস্কার
কারিগরি সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বিমান ইতোমধ্যে একটি চার সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তারা ১ জুলাই থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত সব কারিগরি ঘটনার নথি যাচাই করছে। কমিটির দায়িত্ব হলো ত্রুটির উৎস চিহ্নিত করা, রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতি পর্যালোচনা করা এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ করা। আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যেই তারা প্রতিবেদন জমা দেবে বলে জানা গেছে।
এছাড়া তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে বিমান গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্টেশনগুলোতে অতিরিক্ত খুচরা যন্ত্রাংশ ও টায়ার সংরক্ষণের ব্যবস্থা করছে, যাতে জরুরি মুহূর্তে ফ্লাইট বিলম্ব এড়ানো যায়। একই সঙ্গে কর্মীদের সমন্বয় ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নতুন নির্দেশনাও জারি করা হয়েছে।
আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার দিকে
বর্তমান ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমকে আরও কার্যকর করতে বিমান তার ‘কম্পোনেন্ট সার্ভিসেস প্রোগ্রাম (CSP)’ এবং ‘রিকমেন্ডেড স্পেয়ার পার্টস লিস্ট (RSPL)’ পুনর্বিবেচনা করছে। এর পাশাপাশি ‘টেইলর্ড পার্ট প্যাকেজ (TPP)’ আপডেটের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম চাহিদা পূরণে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বিমান কর্মকর্তাদের মতে, আগের তুলনায় প্রযুক্তিগত নির্ভরতা অনেক বেড়েছে। ফলে রক্ষণাবেক্ষণ এখন আর শুধু যান্ত্রিক কাজ নয়, বরং ডেটা বিশ্লেষণ, সফটওয়্যার আপডেট ও ইঞ্জিন মনিটরিংয়ের মতো বিষয়গুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।
প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন
ইঞ্জিনিয়ারিং টিমের দক্ষতা বাড়াতে বিমান নতুন শিক্ষানবিশ মেকানিক নিয়োগ দিচ্ছে এবং অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছে। এতে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও নেওয়া হচ্ছে। সংস্থার মতে, দীর্ঘমেয়াদে এ পদক্ষেপগুলো রক্ষণাবেক্ষণের মান উন্নত করবে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
লক্ষ্য: আস্থা ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, তাদের মূল লক্ষ্য হলো নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ ফ্লাইট পরিচালনা নিশ্চিত করা। সাম্প্রতিক কারিগরি বিঘ্ন যাত্রীদের আস্থায় কিছুটা প্রভাব ফেললেও, বোয়িংয়ের সহযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মাধ্যমে সেই আস্থা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।
একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, “বিমান বাংলাদেশের মতো একটি জাতীয় এয়ারলাইনকে শুধু দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নির্ভরযোগ্য হতে হবে। বোয়িংয়ের এই অন-সাইট সহযোগিতা সেই যাত্রারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।”
বিমানের আশা, এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়াবে এবং বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে।ফাইল



