মহামায়া হ্রদে অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনায় হতাশ পর্যটকরা

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের দুর্গাপুর ইউনিয়নে পাহাড়ঘেরা মহামায়া হ্রদ একসময় ছিল স্বচ্ছ জল আর শান্ত সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য যেন অতীত। হ্রদের বড় অংশজুড়ে ছড়িয়ে আছে টোপাপানার চাদর, পাড়ের ঘাস-লতাগুল্মে ভরাট, আর চারপাশে প্লাস্টিক ও বিভিন্ন আবর্জনার স্তূপ। পর্যটকদের চোখে পড়ছে অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার চিত্র।

হ্রদের সৌন্দর্যে আগাছার থাবা

প্রায় ১১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই কৃত্রিম হ্রদের ৩ থেকে ৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা এখন পানাজাত আগাছায় ঢাকা। এতে মাছের বিচরণক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, হ্রদের পরিবেশব্যবস্থাও হুমকির মুখে। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য নৌপরিভ্রমণের এলাকা সংকুচিত হয়ে এসেছে।

ইকোপার্কে গিয়ে পর্যটকদের ভোগান্তি

মূল ফটক পেরোলেই শুরু হওয়া সুন্দর রাস্তা উঠেছে বাঁধের দিকে। আগে যেখান থেকে মনভরানো স্বচ্ছ পানির দৃশ্য দেখা যেত, আজ সেখানে দেখা যায় টোপাপানার স্তর আর কালচে পানির রং। বেঞ্চগুলো দখল করে আছে ময়লা, ঘাসে ঢেকে গেছে বাঁধের ধারের পথ।

নিষিদ্ধ ইঞ্জিনচালিত নৌকা, নেই নিরাপত্তা

ইকোপার্কের নিয়ম অনুযায়ী হ্রদে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালানোর অনুমতি নেই। কিন্তু এখন সেখানে চলছে ৪২টির বেশি ইঞ্জিনচালিত নৌকা। কোনো লাইফজ্যাকেট ছাড়াই পর্যটক বহন করা হচ্ছে। নৌকার শব্দে পাখিদের স্বাভাবিক পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে।

এক নৌচালক জানান, প্রতি ট্রিপে বড় নৌকা থেকে ইজারাদার নেন ৬০০ টাকা, ছোট নৌকা থেকে ৪০০ টাকা। পর্যটকদের কাছ থেকে বড় নৌকা ভাড়া ২ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।

টিকিটে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ

সরকারি নির্ধারিত টিকিট মূল্য ২০ টাকা হলেও পর্যটকদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ৩০ টাকা। টিকিটে কোনো মূল্যছাপ না থাকায় প্রকৃত মূল্য জানার উপায় নেই বলে অভিযোগ করেন আগত দর্শনার্থীরা।

চট্টগ্রাম থেকে আসা পর্যটক তাওসিফ মারুফ বলেন, “দাম লেখা নেই, তাই আসল মূল্য জানা গেল না। পরে বুঝলাম অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়েছে।”

পর্যটকদের ক্ষোভ

ঢাকা থেকে আগত মো. ফরিদুল করিম বলেন, “এক বছর আগেও হ্রদ ছিল চোখ জুড়ানোর মতো। এখন সমস্ত জৌলুস হারিয়েছে। পানির রং মলিন, আশপাশ অগোছালো, আগাছায় ভরা—এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে মানুষ আর এখানে আসবে না।”

ইজারাদার ও প্রশাসনের অবস্থান

ইজারাদারের প্রতিনিধি তছলিম উদ্দিন বলেন, “সরকারি উদ্যোগ নেই বলে নিজেদের খরচে কিছু অংশ পরিষ্কার রাখছি। ইজারামূল্য বেশি, তাই টিকিটে একটু বাড়তি নেওয়া হয়।”

অন্যদিকে, বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আল আমিন জানিয়েছেন, “ইঞ্জিনচালিত নৌকা বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। টিকিটে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পানা অপসারণে বরাদ্দের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”

সংক্ষেপে সমস্যাগুলো

  • হ্রদের বড় অংশজুড়ে আগাছা ও টোপাপানা
  • অবৈধ ও অনিরাপদ ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচল
  • টিকিটে অতিরিক্ত টাকা আদায়
  • বন বিভাগ ও ইজারাদারের দায়িত্বহীনতা
  • পরিবেশ ও পর্যটন সম্ভাবনা ধ্বংসের মুখে

মহামায়া হ্রদকে রক্ষা করতে দ্রুত আগাছা অপসারণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং কঠোর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জরুরি—না হলে বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই পর্যটনকেন্দ্র হারিয়ে যাবে নীরবে।

Read Previous

ঢাকার গণমাধ্যমে নারী কর্মীর মৃত্যু: যৌন হয়রানি নিয়ে তোলপাড়

Read Next

কেপিআই স্থাপনাগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা – পুলিশ বাহিনীর বিশেষ নজরদারি শুরু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular