
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাবে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বড় ধস নেমেছে কলকাতার পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত নিউ মার্কেট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ও মারকুইস স্ট্রিট সংলগ্ন অঞ্চল, যেখানে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি রুপি। সামগ্রিকভাবে কলকাতার ক্ষতির পরিমাণ ছুঁয়েছে ৫ হাজার কোটি রুপি বলে দাবি করছেন ব্যবসায়ীরা।
প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তার পরবর্তী কূটনৈতিক জটিলতার কারণে ভারতের ভিসা নীতিতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। বর্তমানে শুধু সীমিত জরুরি ভিত্তির ভিসা দেওয়া হলেও তা পর্যটন খাতের জন্য পর্যাপ্ত নয়।
ফিরে এসেছে কোভিডকালীন নিস্তব্ধতা
করোনাকাল পেরিয়ে যখন পর্যটন খাত ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, তখন এই ভিসা নিষেধাজ্ঞা হয়ে উঠেছে আরেকটি কঠিন আঘাত। এক বছর আগেও নিউ মার্কেট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ও মারকুইস স্ট্রিট ছিল বাংলাদেশি পর্যটকে মুখর। আজ সেই চিত্র বদলে গিয়ে রাস্তাঘাট হয়ে পড়েছে প্রায় জনশূন্য।
ব্যবসায় ধস: বন্ধ হচ্ছে রেস্তোরাঁ ও হোটেল
ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হায়দার আলী খান জানান, একসময় পর্যটন, হোটেল, রেস্তোরাঁ, ট্র্যাভেল এজেন্সি, মানি এক্সচেঞ্জ, চিকিৎসা ও পরিবহন খাতে প্রতিদিন লেনদেন হতো প্রায় ৩ কোটি রুপি। এখন সেই লেনদেন নেমে এসেছে প্রায় শূন্যে।
রাঁধুনি রেস্তোরাঁর মালিক এন সি ভৌমিক বলেন, “আমাদের আয় ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
মারকুইস স্ট্রিটের কারেন্সি এক্সচেঞ্জার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক মোহাম্মদ ইন্তেজার বলেন, “আমরা প্রায় পুরোপুরি বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। এখন টিকে থাকাটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
জীবিকা হারাচ্ছেন পর্যটন-নির্ভর মানুষজন
এই সংকট কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, প্রভাব ফেলেছে হাজারো মানুষের জীবিকায়ও। গাইড, রাঁধুনি, গাড়িচালক, হোম-স্টে অপারেটর, হোটেল কর্মচারীদের আয় বন্ধ হওয়ার পথে।
এলিয়ট রোডের গাড়ি মালিক ফারহান রসুল বলেন, “কোভিড পরবর্তী পর্যটন চাহিদা দেখে আমি দুটি গাড়ি কিনেছিলাম। এখন মাসে পাঁচ-ছয়ের বেশি বুকিং হয় না। অথচ আমাকে প্রতি মাসে দেড় লাখ রুপি কিস্তি দিতে হয়।”
সমাধান চায় ব্যবসায়ী মহল
কলকাতার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা দ্রুত ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তন ও ভিসা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই এমন সংকট আবারও তাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
“আমরা শুধু ব্যবসা হারাইনি, জীবনের স্থিতি হারিয়েছি,”— বলছিলেন ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের এক প্রবীণ ব্যবসায়ী।
পর্যটননির্ভর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে দুই দেশের সরকারের সক্রিয় উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।



