
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্ত্তিপাশা ইউনিয়নের ভীমরুলি খালের ভাসমান পেয়ারার হাটে। শ্রাবণ-ভাদ্র মাসজুড়ে প্রতিদিন সকালে শত শত ছোট নৌকায় করে আসেন চাষিরা, সাথে আসে মৌসুমি ফলের সম্ভার। স্থানীয় পেয়ারার স্বাদ ও হাটের ব্যতিক্রমী পরিবেশে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ হচ্ছেন দেশি-বিদেশি পর্যটকরা।
সম্প্রতি এই ভাসমান হাট পরিদর্শনে আসেন বাংলাদেশে নিযুক্ত আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত আবদেলোহাব সায়দানি। পেয়ারা বাগান ও ভাসমান বাজার দেখে তিনি বলেন, “এই বাজার সত্যিই এক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা। আলজেরিয়ায় পেয়ারা হয় না, তাই এখান থেকে রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে।”
পেয়ারা ছাড়াও হাটে বিক্রি হয় আমড়া, লেবু, বিভিন্ন শাকসবজি ও মৌসুমি ফল। প্রতি শুক্রবার এখানে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় বেশি হয়। বর্তমানে পেয়ারা মণপ্রতি পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৭০০-৮০০ টাকায়।
ভাসমান হাটের আশপাশে গড়ে উঠেছে নানা বিনোদন সুবিধা। বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত পেয়ারা পার্কে রয়েছে শিশুদের খেলাধুলার ব্যবস্থা, নৌভ্রমণ ও সরাসরি গাছ থেকে পেয়ারা ছেঁড়ে খাওয়ার সুযোগ।
২০০ বছরের ঐতিহ্য স্থানীয় চাষি সব্রজিৎ ও পরিমল হালদার বলেন, প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এ অঞ্চলে পেয়ারা চাষ হয়ে আসছে। এটাই তাঁদের পরিবারের প্রধান জীবিকার উৎস। তবে এ বছর বৃষ্টি কম হওয়ায় ফলন কম হয়েছে। তারপরও দাম কিছুটা ভালো, ফলে লাভের আশায় রয়েছেন চাষিরা।
আড়তদার সঞ্চয় হালদার জানান, পেয়ারা ফলন কম হওয়ায় দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ, এতে পাইকারদের লাভের মার্জিন কমে গেছে। পাইকার জামাল হোসেন বলেন, “যদি ৪০ টাকায় কিনি, তবে শহরে ৫০ টাকা দরে বিক্রি করলেও লাভ থাকে না, কারণ পরিবহন ও শ্রমিক খরচ অনেক বেড়েছে।”
ভাসমান পেয়ারা হাট শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, এটি এ অঞ্চলের আবেগ ও সংস্কৃতির প্রতীক বলেও জানান প্রবীণ ভবেন্দ্রনাথ হালদার। “এখানে প্রায় শতভাগ পরিবার পেয়ারা চাষের সঙ্গে জড়িত,” তিনি বলেন।
পর্যটনে নতুন সম্ভাবনা কুড়িয়ানা পেয়ারা পার্ক ও ইকো কটেজের উদ্যোক্তা অর্নব মজুমদার জানান, প্রতিদিনই পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। “দেশ-বিদেশ থেকে আসা পর্যটকরা এখানে এসে পেয়ারা ছিঁড়ে খাওয়ার আনন্দ পান—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ,” তিনি বলেন।
ঝিনাইদহ থেকে আসা পর্যটক মশিউর রহমান বলেন, “ভাসমান হাট আর পেয়ারা পার্ক দেখে আমি সত্যি মুগ্ধ। এমন অভিজ্ঞতা জীবনে খুব কমই পাওয়া যায়।”
প্রশাসনের উদ্যোগ ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, “এ বছর জেলায় ৫৬২ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হয়েছে। আমরা আশা করছি ৫ হাজার ৬২৬ টন পেয়ারা উৎপাদিত হবে, যা থেকে কয়েক কোটি টাকা আয় হবে।”
প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, ঐতিহ্যবাহী কৃষি ও পর্যটনের অনন্য সমন্বয় ঘটেছে এই ভাসমান পেয়ারা হাটে। যথাযথ পরিকল্পনা ও প্রচারণা পেলে এটি হয়ে উঠতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ।



