স্কাইট্র্যাক্স তালিকায় জায়গা পায়নি বিমান বাংলাদেশ, প্রশ্ন উঠছে ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স

ফাইল ছবি

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ৫৪ বছরের দীর্ঘ যাত্রায় সরকারি সহায়তার অভাব হয়নি, তবুও জাতীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স স্কাইট্র্যাক্সের ২০২৫ সালের বিশ্বের শীর্ষ ১০০ বিমান সংস্থার তালিকায় স্থান করে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক এয়ার ট্রান্সপোর্ট রেটিং সংস্থা স্কাইট্র্যাক্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বিমানের অবস্থান নবম।

সেবার মানে স্থবিরতা, অভিযোগ যাত্রীদের

যাত্রী সেবার নানা দিক—আসনের আরাম, ইন-ফ্লাইট বিনোদন, খাবারের মান, পরিচ্ছন্নতা ও কর্মীদের আচরণ—এই সব সূচকের ওপর নির্ভর করে স্কাইট্র্যাক্স তাদের বার্ষিক র‌্যাঙ্কিং তৈরি করে। সেখানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স পেয়েছে তিন তারকা রেটিং।
তবে যাত্রীরা নিয়মিত অভিযোগ করছেন টিকিটের মূল্য, ফ্লাইট বাতিল, প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও কেবিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে। গত কয়েক মাসেই বেশ কয়েকটি যান্ত্রিক সমস্যার কারণে বিমানকে আলোচনায় আসতে হয়েছে।

সুচিপত্র

বিমানের অবস্থান ও বহর

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ১৯টি বিমান পরিচালনা করছে—দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯, চারটি বোয়িং ৭৮৭-৮, চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর, চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এবং পাঁচটি ড্যাশ-৮ কিউ৪০০। এসব বিমান দিয়ে ২২টি আন্তর্জাতিক ও সাতটি অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে।
বিমানের জেনারেল ম্যানেজার (জনসংযোগ) এবিএম রওশন কবির দাবি করেছেন, “বর্তমানে কোনও বিমান গ্রাউন্ডেড নেই। সাম্প্রতিক যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো বিচ্ছিন্ন। আমাদের প্রকৌশলীরা বিষয়গুলো গভীরভাবে তদন্ত করছেন।”
প্রকৌশল বিভাগের প্রধান ক্যাপ্টেন তানভীর খুরশিদের নেতৃত্বে ইতিমধ্যে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

ক্রমবর্ধমান বিমান বাজার, কিন্তু বিমানের অবস্থান স্থবির

বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষেরও বেশি বিমানযাত্রী পরিবহন করা হয়, যেখানে প্রবৃদ্ধির হার বছরে ১০ শতাংশের ওপরে। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (IATA) অনুমান করছে, আগামী দশ বছরে এই সংখ্যা আড়াই কোটিতে পৌঁছাবে।
তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমান এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না। বিমানের প্রাক্তন বোর্ড সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, “একটি বিমান সংস্থা ৫৪ বছরে পরিণত বয়সে পৌঁছে যায়। কিন্তু বিমান আজও আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার বেড়াজালে আটকে আছে। বারবার কর্মকর্তাদের পরিবর্তন, কোনও ধারাবাহিকতা নেই—এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।”

লাভের মুখ দেখলেও ঋণের বোঝা বিশাল

বিমান ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৮২ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় দশগুণেরও বেশি। তবুও আর্থিক অবস্থার চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের ঋণ ও দায় প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকা
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের টাস্কফোর্স ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে, কর্মক্ষমতা লক্ষ্য পূরণ না হলে বিমানকে ভেঙে নতুন জাতীয় ক্যারিয়ার গঠনের প্রস্তাব কার্যকর করা হতে পারে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিমানের অর্ধেক সম্পদ ও কর্মী দিয়ে নতুন সংস্থা চালু করা যেতে পারে।

প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে বিমান

দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিযোগীরা যেমন এয়ার ইন্ডিয়া, শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্স, ইন্দিগো—তারা দ্রুত বহর নবায়ন, ডিজিটাল বুকিং ব্যবস্থা, ইন-ফ্লাইট সার্ভিস উন্নয়ন এবং গ্রাহক অভিজ্ঞতায় বিনিয়োগ করছে।
অন্যদিকে, বিমান এখনও পুরনো কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেরি প্রতিযোগিতায় তাকে পিছিয়ে দিচ্ছে।

ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের সাফল্য, বিমানের জন্য শিক্ষা

তুলনামূলকভাবে দুর্বল অর্থনীতির দেশ ইথিওপিয়া থেকেও ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স এখন বিশ্বের ৩৮তম স্থানে। তাদের সাফল্যের মূল কারণ—স্বাধীন ব্যবস্থাপনা, পেশাদার সিদ্ধান্ত গ্রহণ, এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
বিমানের ক্ষেত্রেও যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত কাঠামো গড়ে তোলা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পতাকাবাহী সংস্থাটি আবারও বিশ্ব মানচিত্রে নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারবে।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

বিমান বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই ক্রমবর্ধমান বাজারে টিকে থাকতে তারা কতটা দ্রুত সংস্কার আনতে পারবে। আধুনিকীকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহক সন্তুষ্টি বাড়ানো ছাড়া সামনে এগোনো কঠিন।

যাত্রীরা এখন শুধু গন্তব্য নয়, অভিজ্ঞতা খোঁজেন। আর সেই অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে না পারলে, সরকারি সহায়তা যতই থাকুক না কেন, জাতীয় পতাকার গর্ব ধরে রাখা কঠিন হবে।

Read Previous

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সে কেবিন ক্রু নিয়োগ: তরুণ-তরুণীদের জন্য আকর্ষণীয় সুযোগ

Read Next

এয়ার অ্যাস্ট্রা পেল আইওএসএ সার্টিফিকেশনের নবায়ন: নিরাপত্তা মানে নতুন মাইলফলক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular