
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে আবারও শুরু হয়েছে অবৈধ দোকানপাট বসানোর চেষ্টা। রাতের আঁধারে গত রোববার শতাধিক কাঠের টংঘর বসানো হয় বালিয়াড়ির ওপর। উপরে টিনের ছাউনি, চারপাশে নকশা করা কাঠের ফ্রেম আর নিচে লাগানো চাকা—এবার ভ্রাম্যমাণ দোকানপাটকে এমন আকারেই সাজানো হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযান এড়াতেই এই অভিনব কৌশল।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে আদালতের নির্দেশে সুগন্ধা পয়েন্টের দেড় শতাধিক অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করা হয়। তারও আগে ডিসেম্বর মাসে একই জায়গায় অভিযান চালানো হয়েছিল। তবু কিছুদিন পর আবার নতুনভাবে দোকান বসানো হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টংঘরের ছবি ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসন ও ট্যুরিস্ট পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। কক্সবাজারের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাশেদুল করিম এবং ট্যুরিস্ট পুলিশের আঞ্চলিক প্রধান ডিআইজি কামরুল আহসান দোকানগুলো সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন।
কিছু ব্যবসায়ী দাবি করেছেন, জেলা প্রশাসনের পর্যটন শাখা থেকেই দোকান বসানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি দোকান বরাদ্দের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। দোকানগুলোতে শামুক-ঝিনুকের পণ্য, প্রবাল, কাপড়, রোদচশমা থেকে শুরু করে ভাজা মাছ, ফুচকাসহ নানা খাবার বিক্রির পরিকল্পনা ছিল।
কেন বারবার দখল?
কক্সবাজারের ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভিড় হয় সুগন্ধা পয়েন্টে। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভিড় থাকে পর্যটকে। বেচাকেনাও চলে জমজমাট। মৌসুমে সুগন্ধার দোকানগুলোতে দৈনিক এক কোটি টাকার বেশি বেচাকেনা হয়। এই বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কারণেই বারবার নতুন করে অবৈধ দোকান বসে যাচ্ছে।
এক ব্যবসায়ী বলেন, “লাখ টাকার বেশি খরচ করে দোকান বসিয়েছি। এবার টংঘরের সঙ্গে চাকা লাগানো হয়েছে, যাতে উচ্ছেদ হলে দ্রুত সরানো যায়।” আরেকজনের ভাষ্য, “সুগন্ধা পয়েন্ট সব সময় ভরপুর থাকে, বিক্রিও ভালো হয়। তাই এখানেই দোকান বসাতে চাই।”
তবে বৈধ ব্যবসায়ীরা বলছেন, গভীর রাতে দোকান বসানো মানে পরিষ্কারভাবে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ করছেন স্থানীয় দুই ব্যক্তি—মোস্তফা হোসেন ও ইমরান উদ্দিন। যদিও তাঁরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
প্রশাসনের অবস্থান
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাশেদুল করিম বলেন, “সৈকতের বালিয়াড়িতে দোকান বসানোর সুযোগ নেই। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা আছে। অনুমতিপত্র থাকলেও সেখানে শর্ত দেওয়া আছে—পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন স্থানে দোকান বসানো যাবে না।”
ট্যুরিস্ট পুলিশের প্রধান ডিআইজি কামরুল আহসান বলেন, “বালিয়াড়ি দখল করে কাউকে দোকান বসাতে দেওয়া হবে না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দোকান সরাতে হবে, নইলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পরিবেশবাদীদের দাবি
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা কমিটি ও স্থানীয় কয়েকটি সংগঠন বলছে, বালিয়াড়ি দখল করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ না হলে তারা কঠোর আন্দোলনে নামবে। তাঁদের মতে, সৈকতের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মূল কারণ এই অবৈধ স্থাপনা।
উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১০ হাজার ৪৬৫ হেক্টর এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়। পরে হাইকোর্টও সৈকতের প্রথম ৩০০ মিটারকে ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ ঘোষণা করে। তবু নিয়ম-আইন উপেক্ষা করে বারবার বালিয়াড়ি দখল হচ্ছে।
বেলার নোটিশ
এদিকে সৈকতের বালিয়াড়ি দখল ঠেকাতে পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ আটজন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ দিয়েছে। নোটিশে হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়ন ও অবৈধ দোকান উচ্ছেদের দাবি জানানো হয়েছে।
কক্সবাজারের প্রকৃত সৌন্দর্য আর জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, বালিয়াড়িতে সব ধরনের বাণিজ্যিক স্থাপনা স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করার বিকল্প নেই।



