সেন্ট মার্টিনে পর্যটন পুনরায় চালু: প্রথম দিনেই ভ্রমণ পাস–বিহীন টিকিট বিক্রিতে জরিমানা

কেয়ারি সিন্দাবাদ

ছবি : পর্যটন সংবাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : দীর্ঘ ১০ মাসের অপেক্ষার পর অবশেষে আবার পর্যটকের পদচারণায় সরব হলো সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। কিন্তু পুনরায় শুরুর দিনেই নিয়মভঙ্গের ঘটনা প্রশাসনের চোখ এড়ায়নি। সরকার অনুমোদিত ভ্রমণ পাস ছাড়াই টিকিট বিক্রির অভিযোগে ‘কেয়ারি জিন্দাবাদ’ নামের ক্রুজ সার্ভিসকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হলো।

এটা আসলে একটা বড় বার্তা—পর্যটন ফিরে এসেছে, কিন্তু এবার কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে।

দীর্ঘ বিরতির পর ক্রুজ সার্ভিসে নতুন গতি

সকাল ৭টা ১৫ মিনিট। কক্সবাজারের নুনিয়াতোরা ঘাটে তখন উৎসবমুখর পরিবেশ। তিনটি ক্রুজ জাহাজে ১,১০৬ জন যাত্রী যাত্রা শুরু করেন দ্বীপের উদ্দেশে। যাত্রীরা কেউ নবদম্পতি, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কেউ আবার গবেষণা ভ্রমণে। এতদিনের অপেক্ষা শেষে আবারো নীল জলের দ্বীপে যাওয়ার উত্তেজনা সবার চোখেমুখে।

দর্শনার্থীদের একজন নবদম্পতি বললেন, “মধুচন্দ্রিমায় এখানে আসার স্বপ্ন ছিল অনেকদিন। প্রথম দিনের এই অনুভূতি—ঠিকভাবে বলতে পারব না। এখানে আসতেই যেন সব কিছুই অন্যরকম লাগে।”

শিক্ষা সফরে আসা প্রাণিবিদ্যার শিক্ষার্থীরাও কম উচ্ছ্বসিত নন। তাদের লক্ষ্য দ্বীপের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য আর প্রবাল সংরক্ষণ বিষয়ক প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ। এক শিক্ষার্থী বলল, “আমরা পরিবেশগত সমস্যা আর দূষণ নিয়েও মাঠ পর্যায়ে কিছু তথ্য সংগ্রহ করব। ক্লাসে যা পড়েছি, তার বাস্তব রূপ দেখতে চাই।”

পরিবেশ রক্ষার কঠোর নির্দেশিকা

দ্বীপের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র রক্ষার জন্য সরকার ফেব্রুয়ারির শুরুতে সেন্ট মার্টিনে পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছিল। পুনরায় খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এবার শর্তগুলো একেবারে স্পষ্ট।

জেলা প্রশাসন মোট ১২টি পরিবেশগত নির্দেশনা দিয়েছে, যা ভ্রমণকালে সবার জন্য বাধ্যতামূলক। যেমন—

  • দ্বীপে প্লাস্টিক বহন সীমিত করা
  • সমুদ্রসৈকতে বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ
  • প্রবাল বা সামুদ্রিক প্রাণীর কোনো ধরনের ক্ষতি না করা
  • নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়া আগুন বা বারবিকিউ না করা

এর পাশাপাশি প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২,০০০ পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবেন। যদিও পুনরায় খোলার প্রথম দিন এই সংখ্যার অর্ধেকও পূরণ হয়নি। প্রশাসনের মতে, এটা ভালোই—কারণ শুরুতেই অতিরিক্ত ভিড় হলে পরিবেশগত চাপ বেড়ে যেতে পারত।

সরকার এবার মাত্র দুই মাসের জন্য রাত্রিযাপনের অনুমতি দিয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই—দ্বীপকে ধীরে ধীরে পর্যটন উপযোগী অবস্থায় ফিরিয়ে আনা, কিন্তু সেই সঙ্গে বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি কমানো।

অনিয়মে দ্রুত ব্যবস্থা

পর্যটন খাতের পুনর্জাগরণের উদ্দীপনা থাকলেও প্রশাসনও খুব সতর্ক। প্রমাণ মিলল প্রথম দিনের ঘটনাতেই। ভ্রমণ পাস ছাড়া টিকিট বিক্রি করার বিষয়টি নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে কেয়ারি জিন্দাবাদ ক্রুজে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয় এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এটা স্পষ্ট করে দেয়—কেউই নিয়মের বাইরে গিয়ে ব্যবসা চালাতে পারবে না।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের স্বস্তির নিশ্বাস

দ্বীপের হোটেল, মোটেল এবং রেস্তোরাঁ মালিকদের জন্য গত দশ মাসটা ছিল কঠিন সময়। পর্যটক না থাকায় তাদের ব্যবসা প্রায় বন্ধের মতো অবস্থা। তাই পুনরায় খোলার ঘোষণা আসতেই দ্বীপে নতুন প্রাণ ফিরে আসে।

এক স্থানীয় ব্যবসায়ী বললেন, “এই দুই মাসই আমাদের মূল ভরসা। এখানকার আয় দিয়েই আমরা বাকি মাসগুলো চলে যাই। তাই পর্যটন চালু হওয়া আমাদের জন্য বড় স্বস্তি।”

নিরাপত্তা আর পরিবেশ—দুটোই সমান গুরুত্বে

জেলা প্রশাসন, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সবাই মিলে পুরো প্রক্রিয়াটি নজরদারিতে রেখেছে। লক্ষ্য দুটি—দর্শনার্থীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা এবং দ্বীপের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করা।

অর্থাৎ আনন্দের ভ্রমণ হোক, কিন্তু দ্বীপ যেন তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য হারিয়ে না ফেলে।

সেন্ট মার্টিন আবার পর্যটকের জন্য খুলেছে—এটা যেমন ভালো খবর, তেমনি দায়িত্বও বড়। প্রশাসনের কঠোরতা বুঝিয়ে দিচ্ছে, এবার ভ্রমণ চলবে নিয়মের মধ্যে। আর পর্যটকরাও যদি সচেতন থাকেন, তাহলে নীল জলের এই প্রবাল দ্বীপ টিকে থাকবে তার স্বাভাবিক সৌন্দর্যে।

Read Previous

এইচএসআইএ-তে সৌদি ফেরত যাত্রীদের লাগেজ বিতর্ক: চুরি নয়, সমন্বয়হীনতার ফল—ইডি রাগীব সামাদের ব্যাখ্যা

Read Next

শীতের পরশে নতুন প্রাণ—মনপুরা এখন দেশের শীর্ষ শীতকালীন পর্যটনস্পট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular