
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : কক্সবাজার বলতেই যে কোলাহলপূর্ণ সমুদ্রতীরের ছবি চোখে ভেসে ওঠে, শ্যামলাপুর সেই ধারণাকে ভেঙে দেয়। ভিড়ভাট্টা, উচ্চস্বরে মাইক, রাইডের চাপে বিরক্তিকর পরিবেশ—এসব কিছু নেই এখানে। আছে শুধু নরম ঢেউয়ের শব্দ, বাতাসের গভীর সোঁতা আর সারি সারি সাম্পান নৌকা। অনেক অভিজ্ঞ ভ্রমণকারীরা একে বলেন—“কক্সবাজারের সবচেয়ে শান্ত বিচ”।
অবস্থান ও যাতায়াত
- অবস্থান: কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার দক্ষিণে, টেকনাফ সড়কের পাশে।
- যাতায়াতের উপায়:
- সিএনজি/চান্দের গাড়ি: শহর থেকে ভাড়া করে নিলে ১২০০–১৫০০ টাকায় পুরো দিন ঘোরা যায়।
- লোকাল বাস/হাইয়েস: কক্সবাজার–টেকনাফ রুটে লোকাল বাসে শ্যামলাপুর বাজার পর্যন্ত ৫০–৭০ টাকা। সেখান থেকে রিকশা/অটো ২০–৩০ টাকা।
- বাইক রাইড: শহরের কলাতলী বা ডলফিন মোড় থেকে বাইক ভাড়া পাওয়া যায় ঘণ্টাপ্রতি ২০০–৩০০ টাকায়।
বিচটির ইতিহাস ও স্থানীয় সংস্কৃতি
শ্যামলাপুর মূলত জেলে সম্প্রদায়ের পুরোনো বসতি। আরাকান অঞ্চলের নৌবাণিজ্যের সময় থেকেই এই উপকূলে মাঝিদের ছোট ছোট ঘাট ছিল। এখনো ভোরবেলা দেখা যায়—
- নৌকা মেরামত করতে থাকা জেলেরা,
- নারীরা ঝিনুক কুড়িয়ে বাসন সাজাচ্ছেন,
- আরকানিজ ধাঁচের লোকসুরে জাল টানার গান।
এখানকার জেলেদের নৌকার গায়ে রঙিন নকশা আর মায়া-ভরা নাম লেখা থাকে—“মা জননী”, “সাগর রানি”, “নুরানী ভেলা”—এগুলো আসলে স্থানীয় আরকান-মগ সংস্কৃতির প্রভাব।
কীভাবে আলাদা এই বিচ?
| বিষয় | শ্যামলাপুর বিচে বাস্তব অভিজ্ঞতা |
|---|---|
| ভিড় | খুবই কম, নিরিবিলি |
| পরিবেশ | ঝাউবনের ছায়া, জেলেপাড়া ও সাম্পান দৃশ্য |
| ফটোস্পট | সাদা বালু, লম্বা ছায়া, সাম্পানের সিলুয়েট |
| সূর্যাস্ত | লাল-সোনালি রং, মেঘের নিচে সূর্যের আগুনঝরা আলো |
| বিশেষত্ব | লোকাল ফিশারম্যান লাইফস্টাইল দেখা যায় কাছে থেকে |
থাকার ব্যবস্থা
শ্যামলাপুর বিচে এখনো বড় রিসোর্ট নেই—এটাই এর আসল সৌন্দর্য ধরে রেখেছে। তবে কাছাকাছি এলাকায় কিছু হোমস্টে ও কটেজ আছে:
| এলাকা | থাকার ধরন | আনুমানিক ভাড়া |
|---|---|---|
| শ্যামলাপুর বাজারের পাশে | লোকাল গেস্টহাউস | প্রতি রাত ৬০০–৮০০ টাকা |
| ইনানী ও পাটুয়ার টেক সড়কের পাশে | ছোট কটেজ টাইপ রিসোর্ট | ১৫০০–৩০০০ টাকা |
| যে কেউ চাইলে | টেন্ট ক্যাম্পিং (বিচে) – স্থানীয় অনুমতি নিতে হবে | ২০০–৩০০ টাকা (টেন্ট ভাড়া) |
টিপস: অনেক ট্রাভেলার রাতে ক্যাম্পফায়ার করে টেন্টে থাকেন। চাইলে গাইডের মাধ্যমে জেলেপাড়ার রান্না করা মাছ খাওয়া যায়।
খাওয়াদাওয়া
শ্যামলাপুর বাজারে ছোট ছোট সীফুড হোটেল আছে, যেখানে—
- সামুদ্রিক মাছ ভাজা (জনপ্রতি ১৫০–২৫০ টাকা)
- ভাত + ভর্তা + শুকনা মাছের ঝাল (৮০–১০০ টাকা)
- তাজা নারকেল পানি (৩০–৪০ টাকা)
- জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনে সরাসরি চুলায় রান্না করার সুযোগ (একদম লোকাল অভিজ্ঞতা)
গোপন টিপ: বিকেলবেলায় ঝাউবনের নিচে “মহিষের দুধের চা” পাওয়া যায়—স্বাদ আলাদা, ঘন আর সুগন্ধি।
লুকানো আকর্ষণ — যা অনেকেই জানেন না
- ভোর ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে জাল নামানোর দৃশ্য ফটোগ্রাফারদের স্বর্গ।
- বাচ্চারা জাল টেনে মাছ ধরার ছোট খেলায় অংশ নেয়—চাইলেই অংশগ্রহণ করা যায়।
- কাছেই আছে “জেলেপাড়ার কাঁকড়া বাজার”—এখানে ১০০ টাকাতেই ৮–১০টা কাঁকড়া পাওয়া যায়, চাইলে রান্নাও করে দেয়।
- শীতকালে লাল কাঁকড়ায় ভরে যায় সৈকতের একাংশ—তখন জায়গাটাকে বলে “লাল বালুর গালিচা”।
মোট খরচের হিসাব — একজন ব্যাকপ্যাকার ভ্রমণকারীর জন্য
| খরচ | টাকা (প্রায়) |
|---|---|
| কক্সবাজার শহর → শ্যামলাপুর (গেলা–আসা সিএনজি শেয়ার) | ২০০ |
| খাবার (দিনভর) | ২৫০–৪০০ |
| বিকেলের চা + নারকেল | ৫০–৮০ |
| লোকাল ফটোস্পট গাইড (ইচ্ছাধীন) | ২০০ |
| মোট | ৬৫০–৯০০ টাকায় পুরো দিন ঘোরা যায় |
কেন শ্যামলাপুর আপনার পরবর্তী ভ্রমণ তালিকায় থাকা উচিত?
- কক্সবাজারের সবচেয়ে নীরব বিচ
- স্থানীয় সংস্কৃতির নিবিড় ছোঁয়া
- কম খরচে অচেনা অভিজ্ঞতা
- পরিবার, ক্যাম্পার আর ফটোগ্রাফি প্রেমীদের জন্য পারফেক্ট
যারা সমুদ্র ভালোবাসেন কিন্তু ভিড় সহ্য করতে পারেন না, তাদের জন্য শ্যামলাপুর হল কক্সবাজারের লুকানো রত্ন। ব্যাকপ্যাক কাঁধে নিন, শহরের কোলাহল ছাড়ুন—ঝাউবনের ফাঁকে ঢেউয়ের গর্জন আপনাকে ডাকছে।
প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার



