
ছবি: রাঙ্গামাটির পাহাড়
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : টানা শৈত্যপ্রবাহে কার্যত থমকে গেছে রাঙ্গামাটির পর্যটন। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কুয়াশা, হিমেল বাতাস আর অস্বাভাবিক ঠান্ডায় পর্যটকদের আনাগোনা কমে এসেছে নাটকীয়ভাবে। পাহাড়, লেক আর ঝুলন্ত সেতুর শহর হিসেবে পরিচিত এই জেলা শীত মৌসুমে সাধারণত পর্যটকে ভরপুর থাকে। কিন্তু চলতি শীতে পরিস্থিতি উল্টো। বুকিং বাতিল, খালি কটেজ, অচল নৌভ্রমণ—সব মিলিয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছে পুরো পর্যটন খাত।
স্থানীয়দের ভাষায়, এবারের শীত স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি কষ্টকর। রাঙ্গামাটি শহরের বনরূপা এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, “ভোরে বের হওয়া দায়। কুয়াশায় কিছুই দেখা যায় না। আগে এই সময়টায় পর্যটকদের ভিড় থাকত, দোকানপাট জমজমাট থাকত। এখন রাস্তাঘাটই ফাঁকা।” তার মতে, পর্যটন কমে যাওয়ায় স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয় সরাসরি কমে গেছে।
পর্যটনের সঙ্গে জড়িত নৌযান পরিচালকরাও পড়েছেন বিপাকে। কাপ্তাই লেকে ভ্রমণই রাঙ্গামাটির অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু কুয়াশা আর ঠান্ডার কারণে অনেক সময় নৌ চলাচল সীমিত রাখতে হচ্ছে। লেকপাড়ের এক নৌচালক আবদুল কাদের জানান, “সকালবেলা কুয়াশায় লেক দেখা যায় না। নিরাপত্তার কারণে ট্রিপ বাতিল করতে হয়। দিনে এক-দুটি ট্রিপও হচ্ছে না। আমাদের দৈনিক আয় অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে।”
সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট ব্যবসা। শহরের বিভিন্ন হোটেলে গিয়ে দেখা গেছে, সাধারণত যে কক্ষগুলো শীত মৌসুমে আগেই বুকড থাকে, সেগুলো এখন ফাঁকা। এক আবাসিক হোটেলের ব্যবস্থাপক রফিকুল হাসান বলেন, “ডিসেম্বর-জানুয়ারি আমাদের পিক সিজন। কিন্তু শৈত্যপ্রবাহ শুরু হওয়ার পর থেকে বুকিং ক্যানসেল হচ্ছে। কেউ কেউ তারিখ পিছিয়ে দিচ্ছেন, কেউ পুরোপুরি বাতিল করছেন। বিদ্যুৎ, কর্মচারী, রক্ষণাবেক্ষণ—সব খরচ ঠিকই আছে, কিন্তু আয় নেই।”
রিসোর্ট মালিকদের বক্তব্যও একই রকম। শহরের বাইরে পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত একটি রিসোর্টের মালিক শামীম চৌধুরী বলেন, “পর্যটকরা ঠান্ডাকে ভয় পাচ্ছেন। পাহাড়ে রাতে তাপমাত্রা আরও কমে যায়। আমরা হিটার, গরম পানি, আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করেছি, তবুও মানুষ আসছে না। এই অবস্থা চলতে থাকলে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে।”
পর্যটক কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে খাবারের দোকান, হস্তশিল্প বিক্রেতা এবং পরিবহন খাতেও। ঝুলন্ত সেতু ও শুভলং ঝর্ণা এলাকায় যেসব দোকানে সাধারণত পর্যটকদের ভিড় থাকে, সেগুলোতে এখন বিক্রি নেই বললেই চলে। এক পাহাড়ি হস্তশিল্প বিক্রেতা জানান, “শীতেই আমাদের বেশি বিক্রি হয়। এখন দিনে দুই-একটা জিনিস বিক্রি হলেও ভাগ্য।”
এদিকে প্রশাসন বলছে, শৈত্যপ্রবাহ একটি প্রাকৃতিক পরিস্থিতি হলেও পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে তারা কাজ করছে। জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, “কুয়াশা ও ঠান্ডার কারণে যেন কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে। নৌযান চলাচলে সতর্কতা জারি আছে। একই সঙ্গে পর্যটন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।”
প্রশাসনের পক্ষ থেকে শীতার্তদের সহায়তায় কম্বল বিতরণ, অস্থায়ী মেডিকেল সাপোর্ট এবং পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর কথাও জানানো হয়েছে। তবে পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাৎক্ষণিকভাবে কিছু প্রণোদনা বা ছাড় না দিলে ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা কঠিন হবে। হোটেল মালিক সমিতির এক প্রতিনিধি জানান, “আমরা চাই ব্যাংক ঋণে কিস্তি স্থগিত, বিদ্যুৎ বিলের ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনা এবং প্রচারণা জোরদার করা হোক, যাতে শৈত্যপ্রবাহ কাটলেই পর্যটকরা ফিরতে উৎসাহ পান।”
সব মিলিয়ে, শৈত্যপ্রবাহ রাঙ্গামাটির পর্যটন শিল্পকে এক অনিশ্চিত অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই স্থবিরতা কাটবে—এমন আশা কমই করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবু পাহাড়ি মানুষের প্রত্যাশা একটাই, কুয়াশা কেটে রোদ উঠবে, লেকে আবার নৌকা চলবে, আর রাঙ্গামাটি ফিরে পাবে তার চিরচেনা পর্যটন
প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ



