শাহজালালের রানওয়ে সংকট: ভ্রমণকারীদের জন্য বাড়ছে ঝুঁকি ও ভোগান্তি

পর্যটন সংবাদ প্রতিবেদক: ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ এয়ার হাব হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে যাত্রীসেবা দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন এই বিমানবন্দর দিয়ে হাজার হাজার যাত্রী দেশ-বিদেশে যাতায়াত করছেন। তবে যাত্রী ও ফ্লাইটের সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় একটি মাত্র রানওয়ে ব্যবহারে এখন মারাত্মক চাপ তৈরি হয়েছে, যা বাড়িয়ে তুলছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং ভ্রমণজনিত ভোগান্তি।

এক রানওয়েতে বিপুল ফ্লাইট: ঝুঁকি কতটা?

বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দরে ৩৬টি আন্তর্জাতিক, ৮টি কার্গো এবং ৪টি দেশীয় এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি হেলিকপ্টার ও প্রশিক্ষণ বিমানও রানওয়ে ব্যবহার করছে। একই রানওয়ে দিয়ে একদিকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, অন্যদিকে বিমান বাহিনীর ট্রেনিং—ফলে প্রায়ই দেখা দিচ্ছে সময়সূচির বিপর্যয়, রানওয়ে জ্যাম এবং আকাশে চক্কর দিতে থাকা উড়োজাহাজের দৃশ্য। অনেক ফ্লাইট নির্ধারিত সময়ের পর ছাড়ছে, এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন।

পর্যটকদের জন্য বাড়ছে অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তা

যাত্রাপথের শুরুতেই যদি বিমানবন্দরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হয়, তবে সেটি পর্যটকদের অভিজ্ঞতায় বিরূপ প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে আগত বিদেশি পর্যটকদের অনেকেই শাহজালাল বিমানবন্দরেই প্রথম অভিজ্ঞতা লাভ করেন। দীর্ঘ সময় আকাশে অপেক্ষা, দেরিতে ল্যান্ডিং এবং টার্মিনালে প্রবেশে বিলম্ব—সবই দেশের পর্যটন খাতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু একটিমাত্র রানওয়ে দিয়ে বিপুল সংখ্যক উড়োজাহাজ পরিচালনা করা বর্তমান সময়ের জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত। রানওয়ের সঙ্গে যুক্ত রাডার ও নেভিগেশনাল সিস্টেম এখনও আধুনিকীকরণ হয়নি। এছাড়া দক্ষ এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার সংকট, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত ট্যাক্সিওয়ের অভাব রানওয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বিকল্প রানওয়ের উদ্যোগ: পর্যটনের জন্য আশার আলো?

বিমানবন্দরের পূর্ব বা পশ্চিম পাশে বিকল্প রানওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও সেটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে। নতুন রানওয়ে নির্মিত হলে ভ্রমণকারীরা অপেক্ষাকৃত নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন, যাত্রাকালও হবে কম সময়ের এবং আরামদায়ক।

তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষের দিকে থাকলেও এটি মূলত যাত্রী ব্যবস্থাপনায় উন্নয়ন আনবে, রানওয়ের ওপর চাপ কমাবে না। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই সমাধানের জন্য বিকল্প রানওয়ের পাশাপাশি নতুন স্থানেই একটি আধুনিক বিমানবন্দর নির্মাণের কথা এখনই ভাবতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

এভিয়েশন বিশ্লেষক কাজী ওয়াহেদুল আলম বলেন, “এই এয়ারপোর্ট ব্যবহারের উপযোগী থাকছে না। আগামী ১০ বছরে যাত্রী সংখ্যা দ্বিগুণ হবে। অথচ রানওয়ে একটি। এতে করে বিমানের দেরি, জ্যাম এবং মাঝ আকাশে অপেক্ষা—সবকিছুই বাড়বে।”

তিনি আরও বলেন, “এই বিমানবন্দরকে ভবিষ্যতে অন্যত্র স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে। একটি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর তৈরি করতে ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লেগে যায়। এখন থেকেই পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে দেশের বিমান ও পর্যটন খাত।”

বিশ্বমানের বিমানসেবা নিশ্চিত করতে হলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। যাত্রীবান্ধব, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যাত্রার নিশ্চয়তা পর্যটকদের দেশমুখী করে তোলে। তাই শুধু তৃতীয় টার্মিনাল নয়, রানওয়ের উন্নয়ন এবং বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে বাংলাদেশ পর্যটন সম্ভাবনার বড় একটি অংশ হারাতে বসবে।

Read Previous

যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অবস্থান: ফেরত পাঠানো হলো ৩৯ বাংলাদেশিকে

Read Next

“জুলাই ঘোষণাপত্র” শিগগিরই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে: উপদেষ্টা আসিফ ফেইসবুক পোস্ট 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular