যুক্তরাজ্যের ই-ভিসা সিস্টেমে ‘ঘোস্ট গ্লিচ’: বাংলাদেশি যাত্রীদের জন্য জরুরি হটলাইন চালু, ভোগান্তির অবসানের আশা

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ঢাকা ও সিলেটের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে যুক্তরাজ্যগামী যাত্রীদের ই-ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা দীর্ঘদিনের ভোগান্তির পর অবশেষে সমাধানের পথে। ব্রিটিশ হোম অফিসের দ্রুত পদক্ষেপে চালু হয়েছে একটি বিশেষ জরুরি হটলাইন, যা যাত্রীদের ম্যানুয়াল ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক উড্ডয়নের অনুমতি প্রদান করবে। ২০২৬ সালের শুরুতে যুক্তরাজ্যের সীমান্ত ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড হওয়ার পর এই ধরনের কারিগরি ত্রুটি প্রথমবারের মতো বড় আকারে দেখা দিয়েছে, যা ‘ঘোস্ট গ্লিচ’ নামে পরিচিত হয়েছে। এই ত্রুটির কারণে গত কয়েকদিনে শতাধিক বৈধ ভিসাধারী যাত্রী বিমানবন্দরে আটকে পড়েছেন, যা পর্যটন ও অভিবাসন খাতে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

এই ‘ঘোস্ট গ্লিচ’টি মূলত যুক্তরাজ্যের ই-ভিসা সিস্টেম এবং এয়ারলাইন্সগুলোর ডাটাবেসের মধ্যে সমন্বয়হীনতা থেকে উদ্ভূত। যাত্রীদের স্মার্টফোন অ্যাপ বা ইউকেভিআই (ইউকে ভিজিটর অ্যান্ড ইমিগ্রেশন) অ্যাকাউন্টে ভিসার স্ট্যাটাস স্পষ্টভাবে ‘বৈধ’ দেখালেও এয়ারলাইন্সের চেক-ইন সিস্টেমে তা দৃশ্যমান হয় না। ফলে ভিসাটি যেন ‘ঘোস্ট’ বা অদৃশ্য হয়ে যায়, যা যাত্রীদের বোর্ডিং পাস প্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, কর্মজীবী এবং পরিবারের সদস্যরা এই সমস্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এমন ঘটনা ঘটেছে যেখানে যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ফ্লাইট মিস করেছেন, যা মানসিক এবং আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়েছে। এই পরিস্থিতি বিমানবন্দরগুলোতে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের জন্ম দিয়েছে, যেখানে পরিবারের সদস্যরা বিদায়ের পরিবর্তে হতাশায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

ব্রিটিশ হোম অফিস এই সমস্যাকে গুরুত্ব সহকারে নিয়ে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর ফলে চালু হয়েছে ২৪ ঘণ্টার প্যাসেঞ্জার সাপোর্ট হটলাইন, যা ই-ভিসা সিস্টেমের ত্রুটি সত্ত্বেও ম্যানুয়ালি ভিসা যাচাই করে যাত্রীদের অনুমতি দেবে। এই হটলাইনের নম্বরগুলো হলো ০৮০০ ৮৭৬ ৬৯২১ (ফ্রি কল) এবং ০২০৩ ৩৩৭ ০৯২৭। এয়ারলাইন্স কর্মীরা চেক-ইন কাউন্টারে যদি সিস্টেম এরর দেখেন, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে এই নম্বরে যোগাযোগ করে যাত্রীর ভিসা স্ট্যাটাস নিশ্চিত করতে পারবেন। এই ব্যবস্থা বাংলাদেশ এবং যুক্তরাজ্যের সময়ের ব্যবধানকে অতিক্রম করে কাজ করবে, যা আগের মতো অফিস টাইমের অপেক্ষায় যাত্রীদের বিপাকে ফেলবে না। হোম অফিসের নির্দেশনা অনুসারে, যাত্রীদের আন্তর্জাতিক রোমিং সক্রিয় রাখা বা বিমানবন্দরের ওয়াইফাই কলিং ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে যোগাযোগ সহজ হয়। এই উদ্যোগটি যাত্রীদের জন্য বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে, কারণ এখন আর ইমেইলের উত্তরের অপেক্ষায় ফ্লাইট মিস করতে হবে না।

যদিও এই হটলাইনটি বর্তমান সংকটের জরুরি সমাধান হিসেবে কাজ করছে, তবে ‘ঘোস্ট গ্লিচ’ এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও উঠে এসেছে। আইনি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হটলাইন চালু থাকার পরও যদি কোনো এয়ারলাইন্স কর্মী যাচাইয়ের জন্য কল করতে অস্বীকার করে এবং যাত্রীর ফ্লাইট মিস হয়, তাহলে সম্পূর্ণ দায়ভার এয়ারলাইন্সের উপর পড়বে। এমনকি যাত্রীদের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার রয়েছে, যা টিকিটের খরচ, আবাসন এবং অন্যান্য ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে। ভবিষ্যতে এমন ভোগান্তি এড়াতে যাত্রীদের ভ্রমণের আগে নিবন্ধিত অভিবাসন আইনজীবীর মাধ্যমে ‘প্রি-ক্লিয়ারড’ স্ট্যাটাস নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এটি ডিজিটাল সিস্টেমের ত্রুটি থেকে সুরক্ষা প্রদান করবে।

এই ঘটনাটি যুক্তরাজ্যের ই-ভিসা ডাটাবেস এবং এয়ারলাইন্স সিস্টেমের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সমন্বয়ের অভাবকে তুলে ধরেছে। ধারণা করা হচ্ছে, হোম অফিস শিগগিরই দক্ষিণ এশিয়া থেকে ফ্লাইট পরিচালনাকারী সব এয়ারলাইন্সকে বাধ্যতামূলক নির্দেশনা দেবে, যাতে তারা বৈধ ডিজিটাল ভিসাধারী যাত্রীদের বোর্ডিং না দেওয়ার আগে অবশ্যই হটলাইনের মাধ্যমে যাচাই করে। এটি না করলে এয়ারলাইন্সগুলোকে জরিমানা বা অন্যান্য শাস্তির মুখোমুখি হতে হতে পারে। ২০২৬ সালের শুরুতে ডিজিটাল সীমান্ত ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর এই ধরনের ত্রুটি প্রত্যাশিত ছিল না, কিন্তু এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম পুরোপুরি কার্যকর হতে আরও সময় লাগবে। ফলে, ম্যানুয়াল ভেরিফিকেশন বা ফোনে যাচাইয়ের পদ্ধতিটি ভ্রমণের নতুন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশি যাত্রীদের জন্য এই উন্নয়নটি পর্যটন এবং অভিবাসন খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। চলতি মাসের শুরু থেকে শুরু হওয়া এই সমস্যা এখন নিয়ন্ত্রণে আসার পথে, কিন্তু এটি ডিজিটালাইজেশনের চ্যালেঞ্জগুলোকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। যাত্রীদের সচেতনতা বাড়ানো এবং সরকারি স্তরে আরও সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। হোম অফিসের এই পদক্ষেপটি অন্যান্য দেশের জন্যও উদাহরণ হতে পারে, যাতে ডিজিটাল ভিসা সিস্টেমের ত্রুটি থেকে যাত্রীদের রক্ষা করা যায়। সামগ্রিকভাবে, এই হটলাইন চালু হওয়া যাত্রীদের যুক্তরাজ্য যাত্রাকে আরও নিরাপদ এবং সহজ করে তুলবে, যা বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে সাহায্য করবে।

Read Previous

গ্রিন নদীর অভূতপূর্ব যাত্রা: পাহাড়ের বুক চিরে নিজস্ব পথের রহস্য উন্মোচন

Read Next

ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা BTTHA ২০২৫-এ টানা দ্বিতীয় হ্যাটট্রিক: বাংলাদেশের হসপিটালিটি খাতে নতুন মাইলফলক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular