
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যুক্তরাজ্যগামী ফ্লাইটে যাত্রীদের অভূতপূর্ব সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। গত এক সপ্তাহ ধরে বহু যাত্রী বৈধ ভিসা, নিশ্চিত রিটার্ন টিকিট, হোটেল বুকিং, ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও চেক-ইন কাউন্টার থেকে বোর্ডিং পাস পাচ্ছেন না। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এয়ারলাইন্সের কম্পিউটার স্ক্রিনে একটি নির্দিষ্ট সতর্কবার্তা প্রদর্শিত হচ্ছে—‘চেক ইন রেসট্রিকটেড, কনট্রাক্ট ইউকে বর্ডার ফোর্স’। এই বার্তা দেখামাত্র কাউন্টার কর্মকর্তারা বোর্ডিং পাস ইস্যু করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। ফলে অনেক যাত্রীকে ফ্লাইট মিস করতে হচ্ছে এবং তারা বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে গত সাত দিনে অন্তত ৪০ জন যাত্রী এই সমস্যার কারণে ফিরে গেছেন বলে ভুক্তভোগী ও বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে। অনেকেই প্রবাসে কর্মরত অবস্থায় ছুটিতে দেশে এসেছিলেন এবং নির্ধারিত তারিখে কর্মস্থলে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বোর্ডিং পাস না পাওয়ায় তারা এখন দেশেই আটকে পড়েছেন। কেউ কেউ পরিবারের সদস্যদের একা রেখে যুক্তরাজ্যে ফিরতে পারছেন না, আবার কেউ কেউ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। এছাড়া টিকিটের টাকা, ভিসা ফি, ভ্রমণ ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা অর্থ ফেরত পাওয়ার অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই সমস্যা শুধু বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের যাত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্যান্য এয়ারলাইন্সের যাত্রীরাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটগুলোতে এই ঘটনা বেশি দেখা যাচ্ছে। বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি বাংলাদেশের কোনো অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যা নয়। সমস্যার মূল কারণ যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের ডিজিটাল সিস্টেমে সৃষ্ট জটিলতা।
যুক্তরাজ্য সরকার বর্তমানে ফিজিক্যাল বায়োমেট্রিক রেসিডেন্স পারমিট (BRP) কার্ড থেকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ই-ভিসা ব্যবস্থায় রূপান্তরের প্রক্রিয়া চালু করেছে। অনেক প্রবাসী ইতোমধ্যে BRP থেকে ই-ভিসায় মাইগ্রেট করেছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে নতুন পাসপোর্টের তথ্য UKVI (UK Visas and Immigration) অ্যাকাউন্টে আপডেট করা হয়নি। ফলে এয়ারলাইন্স যখন যাত্রীর তথ্য যাচাই করতে ‘ইন্টারঅ্যাকটিভ অ্যাডভান্স প্যাসেঞ্জার ইনফরমেশন’ (IAPI) সিস্টেমের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের বর্ডার ফোর্সের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে, তখন সিস্টেমে অমিল দেখা দেয়। এর ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেক-ইন ব্লক হয়ে যাচ্ছে।
এছাড়া সার্ভারের ডেটা সমন্বয়ে বিলম্ব, ই-ভিসা স্ট্যাটাসের আপডেট না হওয়া অথবা সাময়িক সিস্টেম আপগ্রেডের কারণেও এমন ঘটছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক মো. হাফিজ আহমদ বলেন, “এটি আমাদের বিমানবন্দর বা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিজস্ব কোনো ত্রুটি নয়। যুক্তরাজ্যের বর্ডার ফোর্সের সিস্টেমের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়। আমরা বিমান কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এ নিয়ে যুক্তরাজ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। আশা করছি দ্রুত সমাধান হবে।”
তিনি আরও বলেন, “যাত্রীদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যেন তারা নিজ নিজ UKVI অ্যাকাউন্টে লগইন করে স্ট্যাটাস চেক করেন এবং প্রয়োজনে ব্রিটিশ হোম অফিসের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন। এটি কোনো স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং সাময়িক প্রযুক্তিগত জটিলতা।”
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে, তারা যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে এবং সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তবে যাত্রীদের মতে, এই ধরনের সমস্যা যেন আর না ঘটে সেজন্য স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। অনেকে দাবি করছেন, এয়ারলাইন্স ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের উচিত যাত্রীদের আগে থেকেই এ ধরনের সম্ভাব্য জটিলতা সম্পর্কে সতর্ক করা।
এই ঘটনায় প্রবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন, ডিজিটাল রূপান্তরের এই পর্যায়ে যাত্রীদের আরও সচেতন ও প্রস্তুত থাকতে হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য সরকারেরও উচিত এ ধরনের সিস্টেম পরিবর্তনের সময় যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে পর্যাপ্ত তথ্য ও সহায়তা প্রদান করা।



