মহাস্থানগড়: বাংলার প্রাচীন ইতিহাসের অনন্য সাক্ষ্যবাহী এক পর্যটন গন্তব্য

বাংলার ইতিহাসের হাজার বছরের সাক্ষ্য বহন করে দাঁড়িয়ে আছে এক ঐতিহাসিক নিদর্শন—মহাস্থানগড়। বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত এই প্রাচীন নগরী শুধু বাংলাদেশেরই নয়, বরং উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত। প্রত্নতাত্ত্বিক ও পর্যটনপ্রেমীদের কাছে এটি এক চিরচেনা গন্তব্য।

মহাস্থানগড় মূলত প্রাচীন ‘পুন্ড্রনগর’ সভ্যতার রাজধানী হিসেবে পরিচিত। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এখানে গড়ে উঠেছিল এক সুসংগঠিত শহর। ১৯৩১ সাল থেকে এখানে নিয়মিত প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ শুরু হয়, যার ফলে আবিষ্কৃত হয়েছে দুর্গপ্রাচীর, প্রাচীন মন্দির, রাজপ্রাসাদ, মুদ্রা, ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য এবং টেরাকোটা ফলকসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

বর্তমানে মহাস্থানগড় এলাকায় অবস্থিত আকর্ষণীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে গোকুল মেধ (বেহুলার বাসর ঘর), শীলাদেবীর ঘাট, খোদা পাকের ভিটা, জিয়ৎ কুণ্ড, পরাশুরামের স্তম্ভ এবং মহাস্থান জাদুঘর। এসব স্থান ঘুরে দেখা পর্যটকদের জন্য যেমন জ্ঞানগর্ভ অভিজ্ঞতা তৈরি করে, তেমনি ইতিহাসপ্রেমীদের জন্যও এক পরিপূর্ণ অনুভব।

জাদুঘরে ইতিহাসের ছোঁয়া
মহাস্থানগড়ের প্রবেশপথের পাশে অবস্থিত মহাস্থান জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে খননকালে উদ্ধারকৃত বহু দুর্লভ নিদর্শন। এসব নিদর্শনের মাধ্যমে পাওয়া যায় প্রাচীন বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসের স্পষ্ট ধারণা। জাদুঘরে প্রবেশের জন্য টিকিটের ব্যবস্থা রয়েছে এবং সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এটি খোলা থাকে।

যাতায়াত ও সুবিধা
ঢাকা থেকে সড়কপথে বগুড়া পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ৫-৬ ঘণ্টা। বগুড়া শহর থেকে মহাস্থানগড়ের দূরত্ব মাত্র ১৩ কিলোমিটার, যা বাস, সিএনজি অথবা প্রাইভেট গাড়িতে সহজেই যাওয়া যায়। পর্যটকদের সুবিধার্থে আশেপাশে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু হোটেল, রেস্ট হাউস ও রেস্টুরেন্ট।

পর্যটন সম্ভাবনা ও সংরক্ষণে উদ্যোগ
সরকার মহাস্থানগড়কে ‘আঞ্চলিক পর্যটন হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে পর্যটকদের জন্য তথ্যকেন্দ্র, উন্নত সড়ক ব্যবস্থা, দিকনির্দেশক সাইনবোর্ড ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাও উন্নত করা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন পর্যটন উৎসবে মহাস্থানগড়কে ঘিরে বিশেষ আয়োজনও লক্ষ্য করা যায়।

শেষ কথা
মহাস্থানগড় কেবল একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, এটি আমাদের জাতির অতীত ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রমাণ। তাই এর সংরক্ষণ এবং যথাযথ প্রচার-প্রসার আমাদের সবার দায়িত্ব। শিক্ষার্থী, গবেষক, ইতিহাসপ্রেমী কিংবা স্রেফ ভ্রমণপিপাসু—সবার জন্যই মহাস্থানগড় হতে পারে এক অনন্য গন্তব্য।

লেখক:

মওদুদ আহমেদ
ভ্রমণ লেখক ও পর্যটন গবেষক

Read Previous

 পদ্মা সেতুর তিন বছর: দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে

Read Next

ঢাকার বায়ুদূষণ রোধে ‘জিরো সয়েল’ কর্মসূচির যাত্রা শুরু: সবুজায়নের পথে নতুন উদ্যোগ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular