ভ্রমণ ভিসার আড়ালে মানবপাচার: মালয়েশিয়ায় প্রতারিত হয়ে ফিরছেন শত শত বাংলাদেশি

 পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার বমুবিল ছড়ি ইউনিয়নের মোজাফফর আহমদের স্বপ্ন ছিল বিদেশে গিয়ে পরিবারের জন্য একটু ভালো কিছু করা। কর্মী ভিসার সুযোগ না থাকায় তিনি ভ্রমণ ভিসার মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় গিয়ে কাজ করার আশায় ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা দালালের হাতে তুলে দেন। কিন্তু দেশটিতে পৌঁছানোর পর কাজ তো দূরের কথা, উল্টো নির্যাতনের শিকার হয়ে আরও ১ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ করে দেশে ফিরতে হয়েছে তাকে।

মোজাফফরের মতো শত শত বাংলাদেশি বর্তমানে একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়ে মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। প্রতারক চক্র ভ্রমণ ভিসার আড়ালে মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসনের ফাঁদ পেতেছে। ভুক্তভোগীরা জানাচ্ছেন, প্রথমে প্রলোভন দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়, এরপর বিদেশে গিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে চাপে ফেলে আরও অর্থ আদায় করা হয়।

বন্ধ শ্রমবাজার, বাড়ছে চোরাপথে পাড়ি

২০২৩ সালের ৩১ মে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও শ্রমবাজার চালু করতে পারেনি বাংলাদেশ সরকার। এরই সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র ভ্রমণ ভিসার আড়ালে চোরাপথে কর্মী পাঠানোর চেষ্টা করছে।

গত সাত মাসে প্রায় ৪২৬ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে মালয়েশিয়া থেকে। তাদের মধ্যে ৩৫৬ জনকে বিমানবন্দর থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়, আর ৭০ জনকে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও ভুয়া কাগজপত্রের কারণে গ্রেপ্তার করে সাজা দিয়ে ফেরত পাঠায় দেশটি।

সবচেয়ে বড় ফেরতের ঘটনা: ২৫ জুলাই

২০২৫ সালের ২৫ জুলাই মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একদিনেই ২০৩ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়। অভিবাসন শর্ত পূরণে ব্যর্থতা, আবাসনের বুকিং না থাকা ও পর্যাপ্ত তহবিল না থাকার অভিযোগে তাদের ফিরিয়ে দেয় মালয়েশিয়ান ইমিগ্রেশন পুলিশ। একই ধরনের ঘটনা ঘটে গত ১৪ জুলাই, ২১ ফেব্রুয়ারি এবং ২৬ জানুয়ারিতেও।

সরকারের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ উদ্যোগ

বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানায়, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু করতে হলে দেশটির নির্ধারিত রিক্রুটিং এজেন্সির ‘সিন্ডিকেট’ শর্ত মানতে হবে, যা একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বৈধভাবে শ্রমবাজার চালু করতে আন্তরিক চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আগামী ১১ আগস্ট মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন শ্রমবাজার ইস্যুতে আলোচনা করতে। প্রবাসী বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, এই বৈঠক থেকেই খুলে যেতে পারে বন্ধ শ্রমবাজারের দরজা।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মত

অভিবাসন বিশ্লেষক ও রামরু (RAMRU)-এর চেয়ারপারসন ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, “বৈধ শ্রমবাজার চালু না থাকলে এমন মানবপাচার ও অবৈধ প্রবেশের ঘটনা চলতেই থাকবে। তাই সরকারের উচিত সব রাজনৈতিক দলকে এক প্ল্যাটফর্মে এনে শ্রমবাজার চালুর ব্যাপারে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া।”

Read Previous

শেয়ারবাজারে ইতিহাস গড়ল ব্র্যাক ব্যাংক: বাজারমূলধনে এক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে দেশের প্রথম ব্যাংক

Read Next

 থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্তে যুদ্ধবিরতি উদ্যোগে ট্রাম্পের মধ্যস্থতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular