ভ্রমণ কমলেও থেমে নেই ব্যবসা: রমজানে হোটেল–মোটেলগুলোর কৌশলী অভিযোজন

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : রমজান সাধারণত বাংলাদেশের হোটেল–মোটেল ব্যবসার জন্য একটি মিশ্র বাস্তবতা নিয়ে আসে। একদিকে করপোরেট ভ্রমণ কমে, সম্মেলন ও বড় আয়োজন স্থগিত থাকে। অন্যদিকে ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে পারিবারিক ভ্রমণ, অভ্যন্তরীণ পর্যটন এবং ইফতার–ডিনার আয়োজন হোটেলগুলোর জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। ২০২৬ সালের রমজানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বরং অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি আর ভোক্তার ব্যয় সংকোচনের মধ্যেও হোটেল–মোটেল খাত নতুন কৌশলে টিকে থাকার চেষ্টা করছে।

রমজানের প্রথম দুই সপ্তাহে রাজধানী ঢাকার বড় হোটেলগুলোতে রুম অকুপেন্সি সাধারণ সময়ের তুলনায় কম থাকে। করপোরেট গেস্ট, বিদেশি কূটনীতিক ও ব্যবসায়ী ভ্রমণ হ্রাস পাওয়ায় অনেক হোটেলই এই সময়টাকে “লো সিজন” হিসেবে ধরে নেয়। তবে এই শূন্যতা পূরণে ইফতার ও সাহরির বাজারই হয়ে উঠেছে প্রধান ভরসা। রাজধানীর নামী হোটেলগুলো প্রতিযোগিতামূলক ইফতার প্যাকেজ চালু করেছে, যেখানে শুধু খাবার নয়, পরিবেশ, থিম আর সেবার মান দিয়েই অতিথি টানার চেষ্টা চলছে। উদাহরণ হিসেবে Radisson Blu Dhaka Water Garden ও Pan Pacific Sonargaon Dhaka রমজানজুড়ে বিশেষ থিমভিত্তিক ইফতার ও ডিনার বুফে চালু রেখেছে। পরিবার, করপোরেট দল এবং বিদেশি অতিথিদের কথা মাথায় রেখে তাদের মেন্যুতে ঐতিহ্যবাহী বাংলা খাবারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও তুর্কি আইটেম যুক্ত করা হয়েছে।

রমজানের মাঝামাঝি সময় থেকে দৃশ্যপট ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। ঈদের ছুটি ঘনিয়ে এলে অভ্যন্তরীণ পর্যটন বাড়ে, বিশেষ করে সমুদ্র, পাহাড় ও প্রকৃতি–নির্ভর গন্তব্যগুলোতে। Cox’s Bazar, বান্দরবান, রাঙামাটি, কুয়াকাটা কিংবা সিলেট অঞ্চলের হোটেল–মোটেলগুলো এই সময় তুলনামূলক ভালো ব্যবসা করে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এবারও ঈদের আগে এবং পরে প্রায় ৭–১০ দিন এসব এলাকায় রুম বুকিং উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক হোটেল আগেভাগেই ‘ঈদ স্পেশাল প্যাকেজ’ ঘোষণা করেছে, যেখানে রুম ভাড়া ছাড়ের পাশাপাশি ফ্রি ব্রেকফাস্ট, দেরিতে চেকআউট বা স্থানীয় দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা মাথায় রেখে এবার হোটেল–মোটেলগুলো দাম নির্ধারণে তুলনামূলক সংযত নীতি অনুসরণ করছে। আগের মতো হঠাৎ করে রুম রেট বাড়ানোর প্রবণতা কমেছে। বরং অনলাইন বুকিং প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নিজস্ব ওয়েবসাইটে বিশেষ ছাড় ঘোষণা করে আগাম বুকিং নিশ্চিত করার কৌশল নেওয়া হয়েছে। কিছু হোটেল রমজান ও ঈদ মিলিয়ে ‘স্টে অ্যান্ড ডাইন’ প্যাকেজ চালু করেছে, যেখানে নির্দিষ্ট দামে রুমের সঙ্গে ইফতার বা ডিনার অন্তর্ভুক্ত থাকছে। এতে গ্রাহক একদিকে খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন, অন্যদিকে হোটেলগুলোও রুম ও ফুড অ্যান্ড বেভারেজ—দুই দিক থেকেই আয় নিশ্চিত করতে পারছে।

মোটেল ও মাঝারি মানের হোটেলগুলোর পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। বড় শহরের বাইরে যেসব হোটেল মূলত দেশীয় পর্যটকের ওপর নির্ভরশীল, তারা রমজানে শুরুতে কিছুটা ধীরগতি অনুভব করলেও ঈদের ছুটিতে ভালো সাড়া পাচ্ছে।অনেক মোটেল পরিবারকেন্দ্রিক প্যাকেজ, গ্রুপ ডিসকাউন্ট এবং শিশুদের জন্য ফ্রি থাকার সুবিধা দিচ্ছে। আবার কিছু হোটেল স্থানীয় পর্যটন স্পটের সঙ্গে সমন্বয় করে গাইডেড ট্যুর বা পরিবহন সুবিধাও যুক্ত করেছে। এতে গ্রাহকের কাছে পুরো ভ্রমণ পরিকল্পনাটা সহজ হয়ে যাচ্ছে।

রমজানে ক্রেতা টানার আরেকটি বড় কৌশল হলো অভিজ্ঞতা–কেন্দ্রিক সেবা। শুধু থাকার জায়গা নয়, হোটেলগুলো অতিথিদের জন্য ইবাদত–বান্ধব পরিবেশ তৈরির দিকেও নজর দিয়েছে। অনেক হোটেলে নামাজের আলাদা ব্যবস্থা, সাহরির জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মেন্যু, এমনকি কোরআন তিলাওয়াত বা নাশিদ পরিবেশনের মতো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। এসব ছোট কিন্তু অর্থবহ পদক্ষেপ অতিথিদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

হোটেল খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজানের ব্যবসা এখন আর শুধু রুম বুকিংয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, আউটডোর ক্যাটারিং, করপোরেট ইফতার আয়োজন এবং হোম ডেলিভারি—সব মিলিয়ে আয় বহুমুখী করার চেষ্টা চলছে। রাজধানীর বেশ কয়েকটি হোটেল করপোরেট অফিস বা আবাসিক এলাকায় বড় আকারে ইফতার সরবরাহ করছে, যা রুম অকুপেন্সির ঘাটতি পুষিয়ে দিতে সাহায্য করছে।

সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পর্যটন খাতের সমন্বয়ও এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। Bangladesh Tourism Board–এর কর্মকর্তারা বলছেন, রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ পর্যটন বাড়াতে প্রচারণা জোরদার করা হয়েছে। নিরাপদ ভ্রমণ, পরিচ্ছন্নতা এবং সেবার মান নিশ্চিত করতে হোটেল–মোটেল মালিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। যদিও অবকাঠামো ও পরিবহন সংকট এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবুও সমন্বিত প্রচেষ্টায় পর্যটকের আস্থা ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, রমজানের ছুটি বাংলাদেশের হোটেল–মোটেল ব্যবসার জন্য একদিকে চাপের, অন্যদিকে সৃজনশীলতার সময়। বাজারের বাস্তবতা বুঝে যারা দ্রুত কৌশল বদলাতে পারছে, তারাই তুলনামূলক ভালো ফল পাচ্ছে। মূল্যছাড়, থিমভিত্তিক ইফতার, পরিবার ও গ্রুপ প্যাকেজ, আর ইবাদত–বান্ধব সেবা—এই সমন্বয়ই এবার ক্রেতা টানার মূল অস্ত্র। সামনে ঈদের দীর্ঘ ছুটি ঘিরে যদি সার্বিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকে, তবে রমজানের পরের দিনগুলো হোটেল–মোটেল খাতের জন্য স্বস্তির বার্তাই বয়ে আনতে পারে।

প্রতিবেদক : আহাদ হোসেন খান

Read Previous

বিমানবন্দরে লাগেজ ভোগান্তি কমাতে দ্রুত সংস্কারের পথে সরকার

Read Next

তেঁতুলিয়ায় টিউলিপের রঙিন বিপ্লব: সীমান্ত জনপদে কৃষি ও পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular