
ফাইল ছবি
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পাসপোর্ট শুধু ভ্রমণের একটি নথি নয়—এটি একটি দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান, কূটনৈতিক প্রভাব এবং নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধার প্রতিফলন। এজন্যই প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান দেশগুলোর পাসপোর্ট র্যাংকিং বা সূচক প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে বোঝা যায় কোন দেশের নাগরিক কত সহজে ভিসা ছাড়াই বা অন-অ্যারাইভাল ভিসায় বিদেশ ভ্রমণ করতে পারেন।
এখন প্রশ্ন হলো, এই র্যাংকিং কীভাবে নির্ধারণ করা হয় এবং কোন কোন বিষয় এতে প্রভাব ফেলে? চলুন বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক।
র্যাংকিং নির্ধারণ করে কারা
বিশ্বজুড়ে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা পাসপোর্টের শক্তি পরিমাপ করে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি হলো—
১. হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স (Henley Passport Index) – যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান Henley & Partners এই সূচক প্রকাশ করে। তারা আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (IATA)-এর তথ্য ব্যবহার করে দেশগুলোর পাসপোর্ট র্যাংক নির্ধারণ করে।
২. আর্তন ক্যাপিটাল পাসপোর্ট ইনডেক্স (Arton Capital Passport Index) – এটি একটি অনলাইনভিত্তিক সূচক, যেখানে “ভিসা ফ্রি স্কোর” হিসাব করে দেশগুলোর ক্রমানুসার নির্ধারণ করা হয়।
এছাড়াও Global Passport Power Rank এবং Nomad Passport Index নামের আরও কিছু সংস্থা এই ধরনের তালিকা প্রকাশ করে থাকে।
র্যাংকিং নির্ধারণের মূল ভিত্তি
১. ভিসা ফ্রি অ্যাকসেস
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো—একটি দেশের নাগরিক কতটি দেশে ভিসা ছাড়াই প্রবেশ করতে পারেন। যত বেশি দেশে ভিসা ছাড়াই যাওয়া যায়, সেই দেশের পাসপোর্ট তত বেশি শক্তিশালী ধরা হয়।
২. অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা
অনেক দেশ বিমানবন্দরে পৌঁছার পর ভিসা দেয়, যাকে বলা হয় ভিসা অন অ্যারাইভাল। এই সুবিধাটিও সূচকে গণনা করা হয়। অর্থাৎ, ভিসা ছাড়াই প্রবেশ এবং অন-অ্যারাইভাল সুবিধা মিলিয়ে যত বেশি দেশে যাওয়া সম্ভব, পাসপোর্টের র্যাংক ততই উঁচু হয়।
৩. ই-ভিসা সুবিধা
বর্তমান সময়ে ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক ভিসা (eVisa) ব্যবস্থাও সূচক নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। যত বেশি দেশে অনলাইনে সহজে ভিসা পাওয়া যায়, পাসপোর্ট ততই কার্যকর বলে বিবেচিত হয়।
৪. কূটনৈতিক সম্পর্ক ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি
একটি দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক যত শক্তিশালী, তার নাগরিকদের জন্য তত বেশি দেশে ভিসা-মুক্ত প্রবেশাধিকার পাওয়া সহজ হয়। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির কারণে তারা একে অপরের দেশে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করতে পারে।
৫. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা
রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল, নিরাপদ এবং আন্তর্জাতিকভাবে আস্থাভাজন দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হয়। এই বিষয়টিও র্যাংকিংয়ে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
৬. অর্থনৈতিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
যেসব দেশ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী, বাণিজ্যে প্রভাবশালী এবং বৈদেশিক সম্পর্কে সক্রিয়, তাদের নাগরিকদের জন্য বিদেশে ভ্রমণ ও ভিসা পাওয়া সহজ হয়। কারণ, এসব দেশের নাগরিকদের অভিবাসনের আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম।
স্কোর নির্ধারণের পদ্ধতি
হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স সাধারণত বিশ্বের ১৯৯টি দেশের পাসপোর্ট এবং ২২৭টি গন্তব্য দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে। প্রতিটি দেশের নাগরিক কতটি দেশে ভিসা ছাড়াই বা অন-অ্যারাইভাল ভিসায় প্রবেশ করতে পারেন, সেই সংখ্যাই তাদের স্কোর হিসেবে গণ্য হয়।
যেমন—যদি কোনো দেশের নাগরিক ১৯০টি দেশে ভিসা ছাড়াই যেতে পারেন, তার স্কোর হবে ১৯০। অন্যদিকে, কোনো দেশের নাগরিক যদি মাত্র ৪০টি দেশে যেতে পারেন, তার স্কোর হবে ৪০—যা তুলনামূলকভাবে নিচের দিকে।
বিশ্বের শীর্ষ পাসপোর্টগুলোর বৈশিষ্ট্য
প্রতি বছর জাপান, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিনল্যান্ড এবং সুইজারল্যান্ডের মতো দেশগুলো তালিকার শীর্ষে থাকে। তাদের নাগরিকরা প্রায় ১৮০টিরও বেশি দেশে ভিসা ছাড়াই বা অন-অ্যারাইভাল সুবিধায় যেতে পারেন।
এই দেশগুলোর সাফল্যের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কূটনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক উন্নতি এবং নাগরিকদের প্রতি বৈশ্বিক আস্থা।
বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশের পাসপোর্ট সাধারণত তালিকার নিচের দিকে অবস্থান করে। কারণ, বাংলাদেশের নাগরিকরা খুব সীমিত সংখ্যক দেশে ভিসা ছাড়াই যেতে পারেন। এর পেছনে কারণ হিসেবে রয়েছে দুর্বল কূটনৈতিক চুক্তি, অভিবাসন নীতির জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক আস্থার সীমাবদ্ধতা।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নত হওয়ায় কিছু নতুন দেশে ভিসা-মুক্ত প্রবেশাধিকার যুক্ত হয়েছে, যা ভবিষ্যতে সূচকে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পাসপোর্ট র্যাংকিং আসলে কোনো দেশের মর্যাদা নির্ধারণের সরাসরি মানদণ্ড নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক চলাচলের স্বাধীনতা এবং বৈশ্বিক আস্থার একটি প্রতিফলন।
যে দেশ যত বেশি বিশ্বসঙ্গে সংযুক্ত, তার নাগরিকদের চলাচলের স্বাধীনতা তত বেশি। তাই পাসপোর্টকে শক্তিশালী করতে হলে শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন কূটনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ় করা, আন্তর্জাতিক বিশ্বাস অর্জন করা এবং নাগরিকদের বৈধ ভ্রমণ সংস্কৃতি গড়ে তোলা।



