
শনিবার শহরের একটি হোটেলে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং টোবগের সাথে সাক্ষাৎ করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন। ছবি: পিআইডি
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং টোবগের ঢাকা সফর দুই দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরেক ধাপ এগিয়ে দিল। ঢাকায় অবস্থানকালে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন—ভুটান বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের আরও বেশি স্বাগত জানাতে আগ্রহী, আর সেই সুযোগটি বাস্তবায়নে তিনি বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা চান।
শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠকে শেরিং টোবগে বলেন, ভুটান তাদের পর্যটন নীতি এমনভাবে সাজিয়েছে যাতে প্রতিবেশী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিশেষ সুবিধা পায়। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের পর্যটকদের প্রতিরাতে ১০০ মার্কিন ডলার টেকসই উন্নয়ন ফি দিতে হলেও বাংলাদেশ, ভারত ও মালদ্বীপসহ কয়েকটি দেশের জন্য এই ফি মাত্র ১৫ ডলার। টোবগের ভাষায়, ভুটানের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও শান্ত পরিবেশ বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য অনন্য অভিজ্ঞতা হতে পারে, আর সেই অভিজ্ঞতা নিতে বাংলাদেশ থেকেই আরও বেশি ভ্রমণকারীকে আসার আহ্বান জানান তিনি।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত
বৈঠকে দুই দেশের প্রতিনিধিদের আলোচনায় উঠে আসে বাণিজ্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব প্রসারের বিষয়গুলো। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, উভয়পক্ষ বাণিজ্য প্রবাহ আরও বাড়াতে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগের নতুন খাত চিহ্নিত করা, প্রক্রিয়াগত জটিলতা কমানো এবং সীমান্ত পাড়ি বাণিজ্যকে আরও দ্রুত ও ঝামেলামুক্ত করতে যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী টোবগে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে “চমৎকার” বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক সদ্ভাবনেই সীমাবদ্ধ নয়; বাণিজ্য, জনসংযোগ ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নেও দুদেশ পরস্পরের পরিপূরক হতে পারে।
কুড়িগ্রামে ভুটানের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল: সম্ভাবনার জানালা
টোবগে বাংলাদেশের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, কুড়িগ্রামে ভুটানের জন্য যেভাবে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন স্তরে নিয়ে যাবে। ইতোমধ্যে ওই স্থানে ভুটান সার্বিক প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। এসইজেড চালু হলে ভুটানের শিল্পকারখানা স্থাপন, কাঁচামাল সরবরাহ, রপ্তানি সুযোগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মতো বহুমুখী সুবিধা তৈরি হবে।
বাংলাদেশের জন্যও এটি বড় সুযোগ—কারণ ভুটানের উৎপাদন ও লজিস্টিক কার্যক্রম থেকে দেশের উত্তরাঞ্চলে নতুন শিল্পঘরানা এবং সংশ্লিষ্ট সেবা খাতে কর্মসংস্থান বাড়বে। একই সঙ্গে সীমান্তীয় বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে।
গেলেফু প্রকল্প: আধুনিকতার সঙ্গে প্রকৃতির সহাবস্থান
বৈঠকে ভুটানের এক আকর্ষণীয় নতুন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন টোবগে। এটি হলো গেলেফুতে নির্মিত হতে যাওয়া জীববৈচিত্র্য শহর। শহরটি হবে আধুনিক, পরিকল্পিত এবং পরিবেশ-সমন্বিত এক নতুন মডেল, যেখানে উন্নয়ন ও প্রকৃতি একসঙ্গে টিকে থাকবে।
গেলেফু শহর গড়ে তোলার জন্য ভুটান বাংলাদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নির্মাণসামগ্রী আমদানি করতে চায়। ফলে বাংলাদেশের ইস্পাত, সিমেন্ট, নির্মাণ পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোর জন্য নতুন বাজার তৈরি হতে পারে। এ বিষয়ে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহও জানান ভুটানের প্রধানমন্ত্রী।
উপস্থিত ছিলেন দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা
বৈঠকে ভুটানের পররাষ্ট্র ও বৈদেশিক বাণিজ্যমন্ত্রী ডিএন ধুঙ্গেল এবং শিল্প, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী লিওঁপো নামগিয়াল দর্জি উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণেই স্পষ্ট—দুই দেশের উন্নয়ন সহযোগিতা কেবল সৌজন্য নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।
লাল গালিচায় অভ্যর্থনা
দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকায় পৌঁছালে শেরিং টোবগেকে বিমানবন্দরে লাল গালিচায় উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তাকে স্বাগত জানান। এই সম্মান ভুটানের প্রতি বাংলাদেশের কূটনৈতিক আন্তরিকতা প্রকাশ করে, এবং সফরের গুরুত্বও বাড়িয়ে তোলে।
ভুটান এমন এক দেশ, যেখানে প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা, নিরাপত্তা এবং আধুনিকতার এক অদ্ভুত সমন্বয় পাওয়া যায়। বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য বিশেষ ছাড়, দুই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং নতুন বিনিয়োগ সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে শেরিং টোবগের এই সফরকে দুই দেশের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।



