
ছবি: সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ছবিবাংলাদেশের বিমান চলাচল খাত দ্রুত বিকাশের পথে। এই সম্ভাবনাকে আরও এগিয়ে নিতে যুক্তরাজ্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার। ঢাকায় এক আলোচনায় ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক ঘোষণা করেন, “আমরা চাই বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বিমান চলাচল কেন্দ্র হয়ে উঠুক, এবং সে লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাজ্য তার পূর্ণ সহায়তা দেবে।”
ইউরোপীয় সংলাপে যুক্তরাজ্যের স্পষ্ট অবস্থান
ঢাকায় ফরাসি দূতাবাসে আয়োজিত “বাংলাদেশের বিমান চলাচল উন্নয়ন নিয়ে ইউরোপীয় সংলাপ”-এ বক্তৃতা দিতে গিয়ে সারাহ কুক বলেন, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী, বিশেষ করে এয়ারবাসের মাধ্যমে। তার ভাষায়, “এয়ারবাস ব্রিটিশ উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক দারুণ উদাহরণ। আমরা বাংলাদেশকে এমন অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সহায়তা করতে চাই যা তাদের বিমান চলাচল খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও স্থিতিশীল করবে।”
এই সংলাপে উপস্থিত ছিলেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত-মনোনীত জিন-মার্ক সেরে-শার্লেট, জার্মান রাষ্ট্রদূত রুডিগার লটজ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। সবাই মিলে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর নবায়ন প্রক্রিয়ায় ন্যায্য প্রতিযোগিতার আহ্বান জানান।
এয়ারবাস বনাম বোয়িং: প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায়
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বর্তমানে তার বহর আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় এয়ারবাস ও বোয়িং উভয়ই বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দিচ্ছে।
এয়ারবাস প্রস্তাব দিয়েছে ১০টি A350 ওয়াইড-বডি এবং ৪টি A320neo ন্যারো-বডি বিমান সরবরাহের, অন্যদিকে বোয়িং দিয়েছে ১০টি ৭৮৭ ড্রিমলাইনার এবং ৪টি ৭৩৭ ম্যাক্স জেটের অফার।
বর্তমানে বিমানের টেকনো-ফাইন্যান্সিয়াল কমিটি দুটি প্রস্তাবই মূল্যায়ন করছে।
বিষয়টি এখন শুধু বাণিজ্যিক নয়, ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। সম্প্রতি মার্কিন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ২৫টি বোয়িং বিমান ক্রয়ের ঘোষণা দিয়েছে, যা এয়ারবাস-বোয়িং প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করেছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত
হাইকমিশনার সারাহ কুক উল্লেখ করেন, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের অন্যতম বৃহৎ উৎস এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার।
তিনি বলেন, “উন্নয়নশীল দেশ ট্রেডিং স্কিম (DCTS) বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় সুযোগ। এই স্কিমের আওতায় ২০২৯ সালের পরেও বাংলাদেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ রপ্তানি পণ্য, বিশেষ করে পোশাক খাত, যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে।”
কুক আরও বলেন, যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠানগুলো — স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, এইচএসবিসি, ইউনিলিভার এবং শীর্ষস্থানীয় খুচরা বিক্রেতারা — বাংলাদেশের অর্থনীতিতে হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। তিনি বাংলাদেশের বাংলাদেশ ব্যাংক, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিইএ) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য চলমান সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন।
বিমানচুক্তি ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতা
২০২৩ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য “বিমান বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদারিত্বের ইশতেহার” স্বাক্ষর করে। এটি দুই দেশের মধ্যে বিমান খাতে সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় খুলে দেয়। সারাহ কুক বলেন, “এই অংশীদারিত্ব আগামী দশকেও শক্তিশালী হবে, বিশেষ করে এয়ারবাসের সঙ্গে প্রযুক্তি ও দক্ষতা বিনিময়ের মাধ্যমে।”
তিনি মিশ্র-বহর কৌশলের (Mixed Fleet Strategy) গুরুত্বের কথাও উল্লেখ করেন। তার মতে, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও জাপানের মতো দেশগুলো বৈচিত্র্যময় বহরের মাধ্যমে দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক সাশ্রয় একসাথে অর্জন করেছে। বাংলাদেশও যদি একই নীতি অনুসরণ করে, তবে তা বাণিজ্যিক ও কৌশলগতভাবে লাভজনক হবে।
যুক্তরাজ্যের প্রতিশ্রুতির মূল বার্তা
সারাহ কুকের বক্তব্যে মূল বার্তা ছিল স্পষ্ট — যুক্তরাজ্য শুধু বিনিয়োগকারী নয়, বাংলাদেশের বিমান চলাচলের উন্নয়নে একজন কৌশলগত সহযোগী হতে চায়। তার ভাষায়, “আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় বিমান চলাচলের একটি মূল কেন্দ্র হতে পারে, এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে আমরা পাশে আছি।”
তিনি তার বক্তব্যের শেষে এয়ারবাসকে ইউরোপীয় সহযোগিতার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “এয়ারবাস এমন একটি কনসোর্টিয়াম যা ইউরোপ জুড়ে দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিকে একত্রিত করেছে। এই শক্তি বাংলাদেশের আকাশে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।”
উপসংহার
বাংলাদেশের বিমান খাত বর্তমানে বড় এক রূপান্তরের দোরগোড়ায়। নতুন বিমান কেনা, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং নীতিগত সংস্কারের এই সময়ে যুক্তরাজ্যের সমর্থন একটি ইতিবাচক বার্তা।
যদি পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন হয়, তবে বাংলাদেশ শুধু তার আকাশসীমায় নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় বিমান চলাচলের এক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
শব্দ সংখ্যা: প্রায় ৭৩৫ ✅



