
ডাঃ নূর-ই-জান্নাত রাখী
ঔষধ ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ
ফরচুন হেলথকেয়ার লিমিটেড
পবিত্র মাহে রমজান আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমের মাস। তবে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সঠিক প্রস্তুতি ছাড়া রোজা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই রমজানের আগে ও মাসব্যাপী কিছু নিয়ম মেনে চললে সুস্থ থেকে ইবাদত করা সম্ভব।
রমজানের পূর্ব প্রস্তুতি
১. ডাক্তারের পরামর্শ নিন: রোজা রাখার জন্য আপনার শারীরিক অবস্থা উপযুক্ত কিনা তা জানতে এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট বা ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
২. ঔষধের সময়সূচি নির্ধারণ: ডাক্তার আপনার ওষুধ ও ইনসুলিনের সময়সূচি পরিবর্তন করতে পারেন যাতে রোজা রাখার সময় রক্তের গ্লুকোজ মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
3. ডায়েট পরিকল্পনা করুন: পুষ্টিবিদের সাহায্যে এমন খাদ্য তালিকা ঠিক করুন, যা রোজায় শরীরের শক্তি ধরে রাখবে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখবে।
৪. হাইপোগ্লাইসেমিয়া ও হাইপারগ্লাইসেমিয়া চিনতে শিখুন: রোজার সময় ব্লাড সুগার কমে গেলে (হাইপো) বা বেড়ে গেলে (হাইপার) কী করা উচিত, তা আগে থেকেই জেনে নিন।
৫. রোজাদার ব্যক্তির হাইপোগ্লাইসেমিয়া হচ্ছে কি-না কি উপসর্গ দেখে বুঝবেন? যদি ডায়েবেটিক রোজাদার ব্যক্তির রোজা অবস্থায় ক্ষুধাভাব, দুর্বলতা ও ক্লান্তি, মাথা ঝিমঝিম করা, হাত-পা কাঁপা, অতিরিক্ত ঘাম, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, বমি বমি ভাব, মাথাব্যথা, অসংলগ্ন কথা বলা ইত্যাদি লক্ষন দেখা যায় তাহলে অবশ্যই সুগার লেভেল চেক করা উচিৎ।
রমজানে সুস্থভাবে রোজা পালনের জন্য টিপস
সঠিক খাদ্যাভ্যাস
• সেহরিতে ধীরে হজম হয় এমন খাবার খান, যেমন ওটস, ডালিয়া, শাকসবজি ও বাদাম।
• ইফতারে ভারসাম্য বজায় রাখুন—খেজুর ও পানি দিয়ে শুরু করে স্বাস্থ্যকর খাবার খান, ভাজাপোড়া পরিহার করুন।
• প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার (ডিম, মাছ, মুরগি) ও আঁশযুক্ত খাবার (ডাল, সবজি) খান, যা দীর্ঘসময় শক্তি বজায় রাখবে।
• পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং সফট ড্রিঙ্ক বা অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার এড়িয়ে চলুন।
ওষুধ ও ইনসুলিন ব্যবস্থাপনা
• যারা মেটফরমিন খান, তারা এটি ইফতার ও সেহরিতে ভাগ করে নিতে পারেন।
• সালফোনাইল ইউরিয়া ওষুধ কম ডোজে সেহরিতে নেওয়া ভালো, তবে যারা নতুন, তারা রোজা না রাখাই উত্তম।
• ইনসুলিন ব্যবহারকারীরা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ইনসুলিনের ডোজ পুনঃনির্ধারণ করুন।
শরীরের পরিবর্তন মনিটর করুন:
• রোজার মধ্যে ঘন ঘন মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, অতিরিক্ত ঘাম বা বিভ্রান্তি অনুভব করলে দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করুন।
• ব্লাড সুগার ৩.৯ mmol/L বা তার নিচে নামলে রোজা ভাঙা জরুরি, নয়তো বড় বিপদ ঘটতে পারে।
হালকা ব্যায়াম ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম:
• ইফতারের পর হালকা হাঁটাহাঁটি করুন, তবে অতিরিক্ত পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন।
• পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন, যাতে শরীর সুস্থ থাকে।
যারা রোজা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ
যদি আপনার টাইপ-১ ডায়াবেটিস থাকে, বা আপনি ইনসুলিনের উচ্চমাত্রায় থাকেন, গর্ভবতী হন, অথবা অতিসাম্প্রতিক সময়ে ডায়াবেটিসজনিত জটিলতায় ভুগে থাকেন, তবে রোজা রাখার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।
সঠিক প্রস্তুতি ও সচেতনতা থাকলে ডায়াবেটিস রোগীরাও সুস্থভাবে রমজানের রোজা রাখতে পারেন। তবে নিজের শারীরিক অবস্থা বুঝে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে এবং নিয়ম মেনে চলাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুস্থ থেকে ইবাদতের তাওফিক দান করুন।



