
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: আগামীকাল, রোববার ৬ জুলাই ২০২৫, সারা দেশে পালিত হবে পবিত্র আশুরা—ইসলামি ক্যালেন্ডারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। হিজরি ১০ মহররম তারিখে সংঘটিত এই দিনটি মূলত কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার স্মরণে শোক ও ত্যাগের প্রতীক হিসেবে পালিত হয়, যেখানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা শহীদ হন।
এই দিনের প্রধান আকর্ষণগুলোর একটি হলো পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক হোসেনি দালান ইমামবাড়া থেকে বের হওয়া তাজিয়া মিছিল, যা শতাধিক বছরের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। প্রতিবারের মতো এবারও শোকগাথা, মাতম, তলোয়ার নৃত্য এবং ধর্মীয় স্লোগানে মুখর থাকবে ঢাকার অলিগলি।
ইসলাম কী বলে মাতম ও তাজিয়া মিছিল সম্পর্কে?
আশুরা উপলক্ষে শোক পালন, ইমাম হুসাইনের আত্মত্যাগ স্মরণ—এসব ইসলামে সম্মানিত হলেও কিছু আচরণ নিয়ে রয়েছে মতভেদ।
সুন্নি মতবাদ অনুযায়ী, মাতম বা শরীর আঘাত করে শোক প্রকাশ ইসলাম সম্মত নয়।
মাওলানা হাফেজ মুশাররফ বলেন—
“ইমাম হুসাইনের শাহাদত আমাদের জন্য দৃষ্টান্ত। তবে শরীর আঘাত করা, রক্ত ঝরানো বা অতিরিক্ত আবেগে গা ভাসানো ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং ধৈর্য ও প্রার্থনার মাধ্যমে শোক প্রকাশ করাই উত্তম।”
অন্যদিকে, শিয়া সম্প্রদায় মনে করে এটি শুধুই শোক নয়, একটি প্রতিরোধের প্রতীক। তাঁরা মাতম ও তাজিয়া মিছিলকে ইতিহাস ও ধর্মীয় দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখেন।
হোসেনি দালানের ট্রাস্টি সৈয়দ হাসান জাফর জানান—
“আমরা শোক প্রকাশ করি আত্মিকভাবে। আমাদের মাতম মানে হৃদয়ের বেদনা প্রকাশ করা—এটি শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য, যা ভক্তির মাধ্যমেই পালন করা হয়।”
ধর্মীয় রীতি না কি ঐতিহ্যবাহী পর্যটন আকর্ষণ?
পুরান ঢাকার তাজিয়া মিছিল এখন শুধু শোক বা ধর্মীয় আচরণ নয়, বরং এক ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবেও পরিগণিত। প্রতি বছর হাজারো মানুষ এই আয়োজন দেখতে ভিড় করে, ধর্মীয় ভক্তদের পাশাপাশি ইতিহাস-সংস্কৃতি অনুরাগীরাও এই আয়োজনে অংশ নেন।

মিছিলের পোশাক, ঢাক-ঢোল, শোকগাথা আবৃত্তি, তলোয়ার নৃত্য—সব মিলিয়ে এটি পর্যটকদের জন্যও এক ব্যতিক্রমধর্মী অভিজ্ঞতা।
নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) আশুরা উপলক্ষে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে। হোসেনি দালান থেকে বের হওয়া মিছিলকে কেন্দ্র করে থাকবে বাড়তি নজরদারি, ড্রোন মনিটরিং, সিসিটিভি ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী।
ডিএমপি কমিশনার আহমেদ নুরুল ইসলাম বলেন—
“আমরা চাই আশুরার সব আয়োজন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হোক। ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান দিয়েই সকল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।”
আশুরা কেবল ইতিহাসের একটি দিন নয়, এটি সত্য, ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত। পুরান ঢাকার তাজিয়া মিছিল সেই স্মৃতি বহন করে আনে একটি ঐতিহ্যের রূপে, যেখানে ধর্মীয় অনুভূতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় একসাথে মিলে যায়।
ইমাম হুসাইনের শিক্ষা আমাদের শেখায়—অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকা, ধৈর্য ধারণ করা এবং মানবতার পক্ষে থাকা।



