
ছবি : সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ধানমন্ডি ৩২ আবারও উত্তেজনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সোমবার দুপুরে ঢাকার সিটি কলেজের সামনের সড়ক দিয়ে দুটি বুলডোজার ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকের রাস্তায়। বুলডোজারের সঙ্গে দেখা যায় একদল তরুণকে, যারা পরিচয় জানতে চাইলে জানান—তারা বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সদস্য। ঘটনার ভিডিও ও ছবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় এলাকাজুড়ে কৌতূহল ও উত্তেজনা দুইই বাড়তে থাকে।
কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারেনি বুলডোজারগুলোর উদ্দেশ্য কী, তবে অনেকেই আগের ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। এ বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি যে ‘বুলডোজার মিছিল’ হয়েছিল, তার সময় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়ির বড় অংশ ভেঙে ফেলার ঘটনা সারা দেশেই আলোচনার ঝড় তোলে। সেই স্মৃতি এখনো তাজা, আর আজকের নতুন দৃশ্য সেটিকে আবার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
রায়কে কেন্দ্র করে উত্তেজনা আরও বাড়ছে
এদিন একদিকে যেমন বুলডোজার নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে ঢাকার রাজনীতিক পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই–আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় পড়া শুরু হওয়ায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এই মামলার প্রধান আসামি।
সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি পায়রা চত্বরে বড় পর্দায় রায় ঘোষণার সরাসরি সম্প্রচার দেখতে মানুষের ঢল নামে। যারা জড়ো হয়েছিলেন, তাদের অনেকেই কঠোর শাস্তি প্রত্যাশা করেন। কেউ কেউ বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যে হত্যাকাণ্ড হয়েছে, তার বিচার মৃত্যুদণ্ড দিলেও পূর্ণ হবে না।” তারা দাবি করেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে দ্রুত রায় কার্যকর করতে হবে।
রায় ঘিরে পুরো রাজধানীতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ধানমন্ডি, শাহবাগ, মৎস্য ভবন, গাজীপুর, উত্তরা—সব জায়গায়ই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।
মামলার পটভূমি ও অভিযোগগুলো
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। এর পর প্রথম যে মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়, তা হলো জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা বিবিধ মামলা। পরে এতে আরও দুইজনকে যুক্ত করা হয়—তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।
তদন্ত প্রতিবেদন ছিল প্রায় নয় হাজার পৃষ্ঠার। সেখানে প্রমাণ হিসেবে ভিডিও, অডিও, নথি, জব্দকৃত সামগ্রী এবং শহীদদের তালিকা সংযোজন করা হয়। মামলায় মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়, যার মধ্যে রয়েছে—
• ঢাবির আন্দোলনকারী ছাত্রদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে উসকানিমূলক বক্তব্য
• আন্দোলনকালে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের সরাসরি নির্দেশ
• রংপুরে ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ
• চানখাঁরপুলে ছয়জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনা
• আশুলিয়ায় ছয়জনকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ
একপর্যায়ে সাবেক আইজিপি মামুন দোষ স্বীকার করে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হতে সম্মত হন। আদালত তার আবেদন মঞ্জুর করে তাকে রাজসাক্ষী বানান। পরে তিনি বিস্তারিত সাক্ষ্য দেন এবং পুরো ঘটনার নির্দেশ–পদ্ধতি নিয়ে বিস্তৃত বিবরণ তুলে ধরেন।
রাজধানীতে চাপা উদ্বেগ
একদিকে রায়, অন্যদিকে বুলডোজার—দুটি ঘটনার সমন্বয় শহরের সাধারণ মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ধানমন্ডি এলাকায় যারা বাস করেন, তারা ঘর থেকে বের হয়ে বিষয়টি দেখেন, অনেকে ভীতও হন। একটা বড় অংশ এখনো নিশ্চিত নয়, বুলডোজারগুলো আদৌ কোনো সরকারি পরিকল্পনার অংশ কি না, নাকি অন্য কোনো গোষ্ঠীর উদ্যোগ।
যা-ই হোক, ধানমন্ডি ৩২ আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি চায় স্বস্তি ও নিরাপত্তা। কিন্তু আজকের দৃশ্য তাদের মনে নতুন করে প্রশ্ন জাগিয়েছে—পরবর্তী ঘণ্টাগুলোতে আরও কী ঘটতে পারে?
পরিস্থিতি কোনদিকে যায়, সেটা এখন সময়ই বলে দেবে।



