দেবতাখুম পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ থাকায় ব্যবসায় ভাটা

বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে ভ্রমণে দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে এ পর্যটন কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বান্দরবানের অন্যতম জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান দেবতাখুম বান্দরবান জেলা শহর থেকে ৩৩ কিলোমিটার ও রোয়াংছড়ি থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার কচ্ছপতলির শীলবান্ধা পাড়া, মারমা ভাষায় যাকে বলা হয় চাগালাওয়া রোয়া। পাড়াটির পাহাড়ি ঢালু পথ বেয়ে ৩০ মিনিট পায়ে হেঁটে পেরুলেই দেবতাকুম প্রবেশদ্বারে দেখা মিলবে তারাছা খ্যং বা তারাছা খাল। খালটিতে রয়েছে নয়নাভিরাম সারি সারি শত সহস্র ছোট বড় পাথরের দৃশ্য। আরও একটু এগোলেই শোনা যায় স্বচ্ছ পানি প্রবাহের কলধ্বনি। সেখান থেকে নৌকা বা বাঁশের ভেলায় উজানের যাত্রাপথে এগোতে গেলে হৃদয় প্রফুল্ল করা শীতল হাওয়া অনুভবের পাশাপাশি দেখা মেলে খালটির স্বচ্ছ পানির নিচে ছোট বড় মাছের উপস্থিতি, যা দেখে মনে হয় কোনো এক অ্যাকুরিয়ামে নৌকা বা বাঁশের ভেলা নিয়ে যাত্রা করার মতোই।

দুই পাশের অন্তত ২ থেকে ৩০০ ফুট উচ্চতার খাড়া পাহাড়ের মাঝে আলো-আঁধারি ঝিরি বেয়ে রোমাঞ্চকর চলার পথ এক ভিন্ন মাত্রার অভিজ্ঞতা যোগ করে ভ্রমণে। এছাড়া অনন্ত কাল ধরে পানি প্রবাহের কারণে পাহাড়ের বুকে সৃষ্টি হওয়া ক্ষত দেখে মনে হয় এ যেন কোনো এক শিল্পীর নিপুণ যতনে আঁকা কোনো ছবি। সব মিলে স্বচক্ষে না দেখলে এই পর্যটন স্পটটির সৌন্দর্য বর্ণনা করা অনেকটাই অসম্ভব।

স্থানীয়রা জানান, দুই বছর আগেও দেবতাখুম পর্যটন কেন্দ্রটিতে প্রতিদিন পর্যটকের সমাগমে মুখরিত থাকত। তাদের সেবায় নিয়োজিত হয়ে এলাকায় অন্তত কয়েকশত লোক পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় জড়িত হয়ে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। দীর্ঘ প্রায় ২ বছর ধরে দেবতাকুম পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ থাকায় ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। অনেকেই জীবিকা নির্বাহের জন্য ভিন্ন পেশায় চলে গেছেন। অত্র এলাকার অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফেরাতে অতি দ্রুত পর্যটন কেন্দ্রটি উন্মুক্ত করে দিতে প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান তারা।

দেবতাখুমের নৌকা চালক অংসিং মারমা বলেন, ৪ বছর ধরে পর্যটকদের দেবতাখুম ঘুরিয়ে দেখান। মাস শেষে ৫ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন। এটা তার বাড়তি আয়, ফলে পারিবারে আর্থিক সচ্ছলতা ছিল। দীর্ঘদিন যাবৎ স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক দেবতাখুম ভ্রমণে পর্যটক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কারণে পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।

দেবতাখুম এলাকার ব্যবসায়ী রবিজয় তঞ্চঙ্গ্যা জানান, তাদের পাড়াটিতে শ’খানেক লোকের বসবাস। মূলত পর্যটকদের আশায় পাড়াটিতে ব্যবসা শুরু করেছিলেন তিনি। দুই বছর আগেও পর্যটকদের সমাগম থাকায় ভালোই ব্যবসা হতো তার। দীর্ঘদিন ধরে পর্যটন কেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তিনি। তাই কেন্দ্রটি খুলে দিতে প্রশাসনের প্রতি দাবি জানান তিনি।

দেবতাখুম পরিচালনা কমিটির সভাপতি নু চো মং মারমা বলেন, এই পর্যটন স্থানকে কেন্দ্র করে ৫২ সদস্য বিশিষ্ট পরিচালনা কমিটি ও ৯৬জন পর্যটক গাইড আছেন। প্রশাসন দেবতাখুম ভ্রমণে পর্যটকদের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে —এই আশায় রাস্তাঘাট ঠিক করা হয়েছে। একইসঙ্গে দেবতাখুম এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ, বাঁশের ভেলা ৫০টি ও ৫টি নৌকা প্রস্তুত করা হয়েছে।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসের দিকে জেলার দুর্গম এলাকা গুলোতে সশস্ত্র সংগঠন গুলোর আনাগোনা বৃদ্ধি পাওয়ায় ওই বছর ১৭ অক্টোবর রুমা-রোয়াংছড়িতে দেশি-বিদেশি পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে স্থানীয় প্রশাসন। এই নিষেধাজ্ঞা কয়েক দফায় বাড়িয়ে রুমা-রোয়াংছড়ি, আলীকদম ও থানচি উপজেলায়ও আরোপ করা হয়।

পরে আলীকদম উপজেলা হতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলেও রুমা-রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলায় বহাল রয়েছে। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও গত বছর ৩ ও ৪ এপ্রিল রুমা ও থানচিতে তিনটি ব্যাংকে ডাকাতি করে সশস্ত্র সংগঠন কেএনএফ। তারপর ৬ এপ্রিল থেকে সন্ত্রাস দমনে নিরাপত্তা বাহীনি অভিযান শুরু করে। চলমান অভিযানে সেনাবাহীনির কর্মকর্তাসহ নিহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন।

Read Previous

পাহাড়ি-বাঙালিদের পার্বত্য মেলা চলছে

Read Next

সেন্টমার্টিন ভ্রমণে বিধিনিষেধ, শুধুই দূষণ নাকি অন্যকিছু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular